ইবাদাত ও দুআ

Under Construction

Under Construction

নামাযের গুরুত্ব ও প্রভাব

আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান আনা এবং তাওহীদ ও রেসালাতের সাক্ষ্য দান করার পর ইসলামে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নামায। এটা আল্লাহ পাকের জন্য খাস একটি ইবাদত। কোরআন শরীফের পঞ্চাশটিরও বেশি আয়াতে এবং নবীজীর শতাধিক হাদীসে দৈনিক পাঁচওয়াক্ত নামায যথাযথভাবে আদায়ের উপর জোর তাগিদ দেয়া হয়েছে। নামাযকে দ্বীনের খুটি এবং ইসলামের বুনিয়াদরূপে উল্লেখ করা হয়েছে। নামাযের অনেক তাছীর ও সুপ্রভাব রয়েছে। সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য প্রভাব হলো, নামায অন্যায় ও অশ্লীলতা থেকে নামাযীকে বাঁচিয়ে রাখে। কোনো বান্দা যখন আল্লাহ তাআলাকে হাজির নাযির জেনে, আল্লাহ তার সম্মুখে আছেন, তার নামায প্রত্যক্ষ করছেন- এই ধ্যান করে, খুশুখুযু তথা বিনয়স্থিরতা ও প্রেমভয় নিয়ে নিয়মিত নামায আদায় করতে থাকে, তখন এই নামাযই রিপুর দোষ থেকে তার অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে দেয়, জীবনকে পরিশীলিত করে তোলে। অন্যায় ও অপরাধ থেকে তাকে দূরে সরিয়ে আনে। এই নামায সততা, সাধুতা, আল্লাহপ্রেম ও খোদাভীতির গুণ তাকে উপহার দেয়। এ জন্যই ইসলামে নামাযের এত গুরুত্ব, সমস্ত ফরজ ইবাদতের উপর নামাযের শ্রেষ্ঠত্ব। এবং এই কারণে নবীজীর আদত ছিলো, কেউ ইসলাম গ্রহণ করলে তাওহীদ শিক্ষা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রথমেই তাকে নামায কায়েমের আদেশ দিতেন, অঙ্গীকার নিতেন।

নবীজীর দৃষ্টিতে নামায ও নামাযী

হাদীস থেকে জানা যায়, নামায না পড়াকে নবীজী কুফুরী কাজ এবং কাফেরের স্বভাব বলে উল্লেখ করেছেন। এক হাদীসে এসেছে,

“যার ভিতরে নামায নেই, তার ভিতর দ্বীনের কোনো হিস্যা নেই।”

অন্য এক হাদীসে নবীজী ইরশাদ করেন,

‘কোনো বান্দা আর কুফরের মাঝে পার্থক্য বোঝা যাবে তার নামায তরকের দ্বারা।’

হাদীসের মতলব হলো, যখন কেউ নামায ছেড়ে দিলো, তখন সে যেন কুফরের সঙ্গে গিয়ে মিলিত হলো। তার নামায না পড়াটা কুফরি কাজের সমতুল্য হলো। নামায আদায় কত বড় সৌভাগ্যের বিষয় আর তরক করাটা কত বড় দুর্ভাগ্যের বিষয় সামনের হাদীস থেকে তা কিছুটা অনুমান করা যাবে। নবীজী ইরশাদ করেন,

‘যে ব্যক্তি নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামায যত্নের সাথে আদায় করবে, কেয়ামতের সময় এ-নামায তার জন্য আলো হবে, তার ঈমান ও ইসলামের দলিল হবে এবং তার নাজাতের ওসিলা হবে। আর যে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়মিত নামায আদায় করবে না, কেয়ামতের বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে নামায তার জন্য আলো হবে না, দলিল হবে না এবং সে আযাব ও শাস্তি থেকে রেহাইও পাবে না।’

দ্বীনি ভাই ও বোন! আমাদের সবারই ভাবা উচিৎ, যদি যত্নের সঙ্গে সময় মতো নামায পড়ে আমরা অভ্যস্ত না হই, তাহলে আমাদের হাশর কী হবে? আমাদের পরিণাম কী দাঁড়াবে?

বে-নামাযীর লাঞ্ছনাকর অবস্থা

কেয়ামতের দিন বেনামাযী সর্ব প্রথম যে অপদস্ততা ও লাঞ্ছনার শিকার হবে, কোরআন মাজীদের একটি আয়াতে তার বিবরণ এসেছে, যার মর্ম নিম্নরূপ-

‘কেয়ামতের সেই কঠিন দিনে যখন আল্লাহ তাআলার বিশেষ নূর প্রকাশ পাবে এবং সকল মানুষকে সিজদায় পড়ে যেতে বলা হবে, তখন (যে খোশনসীব দুনিয়াতে নামায পড়তো, সে তো সিজদায় পড়ে যাবে। কিন্তু) যারা নামায পড়তো না, তারা সিজদার জন্য ঝুঁকতেই পারবে না। (কারণ তাদের কোমরকে কাঠের মতো শক্ত করে দেওয়া হবে।) ভয় ও লজ্জায় তাদের চক্ষু অবনমিত থাকবে। লাঞ্ছনা ও গঞ্জনার আযাব তাদেরকে ঘিরে ফেলবে। এ শাস্তি এই জন্য যে, দুনিয়াতে তাদেরকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে সিজদার জন্য আহ্বান করা হতো, যখন তারা সুস্থ সবল ছিলো। তা সত্ত্বেও তারা সিজদায় ঝুঁকে পড়তো না।’

বেনামাযী ব্যক্তি এক হিসাবে খোদাদ্রোহী। তাকে যত লাঞ্ছিত করা হোক আর যত শাস্তিই দেয়া হোক, সে এর উপযুক্তই বটে। উম্মতের কতক মুজতাহিদ ইমাম তো বেনামাযীকে ইসলাম থেকে খারিজ এবং কতলের উপযুক্ত বলেও মত প্রকাশ করেছেন! আমার দ্বীনি ভাই! নামাযই আল্লহ তাআলার সঙ্গে বান্দার সম্পর্কের ভিত রচনা করে, মানুষকে আল্লাহ তাআলার রহমতের হকদার বানায়। সুতরাং নামায ছাড়া মুসলমান হওয়ার দাবী দলিলহীন ও ভিত্তিহীন।

নামায পড়ার ফায়দা

আল্লাহ তাআলার যে বান্দা দৈনিক পাঁচবার আল্লাহ তাআলার সামনে হাত জোড় করে দাঁড়ায়, তাঁর প্রশংসা ও স্তুতি গায়, তাঁর সামনে ঝোঁকে ও সিজদাবনত হয় এবং দোয়ায় নিমগ্ন হয়, সে বান্দা আল্লাহ তাআলার বিশেষ রহমত ও মহব্বতের অধিকারী হয়ে যায়। তাঁর গোনাহখাতা ঝরে যেতে থাকে, পাপের পঙ্কিলতা থেকে জীবন শুদ্ধ হতে থাকে, অন্তর আল্লাহ তাআলার নূরে নূরানি হয়ে ওঠে। হাদীস শরীফে নবীজী বড় সুন্দর উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়েছেন,

‘বলো তো, তোমাদের কারো ঘরের পাশেই যদি নহরনালা বহমান থাকে, আর সে তাতে দিনে পাঁচবার গোসল করে, তাহলে কি তার শরীরে কোনো ময়লা থাকতে পারে? সাহাবীগণ বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কোনো ময়লা থাকতে পারে না। নবীজী বললেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাযেরও উদাহরণ তেমন। এর বরকতে বান্দার গোনাহখাতা মাফ হয়ে যায়।’

জামাআতে নামায পড়ার গুরুত্ব ও ফজিলত

হাদীস শরীফ থেকে জানা যায়, জামাআতে নামায পড়ার দ্বারা নামাযের প্রকৃত ফজিলত ও বরকত হাসিল হয়। নবীজী জামাআতে নামায পড়ার উপর কঠিনভাবে গুরুত্ব আরোপ করেছেন। যারা অসতর্কতা ও অলসতার কারণে জামাআতে শরিক হয় না, নবীজী একবার তাদের সম্পর্কে বলেন,

‘আমার ইচ্ছা হয় এদের ঘরদোরে আগুন লাগিয়ে দিই।’

বোঝার জন্য এই একটি হাদীসই যথেষ্ট যে, জামাআত তরক করাটা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নিকট কতটা অপছন্দনীয় ছিলো। একটি হাদীসে এসেছে,

‘একা নামায পড়ার চেয়ে জামাআতে নামায পড়লে ২৭গুণ বেশী সওয়াব হয়।’

এছাড়াও জামাআতে নামায পড়ার অনেক ফায়দা রয়েছে। যেমন, এর মাধ্যমে মানুষের মাঝে সময়ানুবর্তিতা সৃষ্টি হয়। দৈনিক পাঁচবার মহল্লার দ্বীনদার ভাইদের সঙ্গে একত্র হওয়ার দ্বারা বড় বড় কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়। জামাআতের পাবন্দীর দ্বারা খোদ নামাযের উপর পাবন্দী নসীব হয়। অভিজ্ঞতায় বলে, যারা জামাআতের পাবন্দী করে না, প্রায়ই তাদের নামায কাযা হয়ে যায়। এমনিভাবে বড় ফায়দা হলো, যারা জামাআতে শরিক হয়, তাদের প্রত্যেকের নামায পুরো মসজিদের জামাআতের একটি অংশ হয়ে যায়। মসজিদের সেই জামাআতে আল্লাহ তাআলার কিছু নেককার বান্দাও থাকেন, যাদের নামায খুশুখুজু পূর্ণ হয়। তাদের নামায যখন আল্লাহ তাআলা কবুল করেন, তখন আল্লাহ পাকের দয়া ও করুণার সামনে এ আশাই হয় যে, এই ধরনের নামাযীর ওসিলায় আমার নামাযও আল্লাহ তাআলা কবুল করবেন, যদিও আমার নামায সেই মানের নামায নয়, আমার নামায কবুল হওয়ার মত নয়। সুতরাং, একান্ত অপারগতা ব্যতীত জামাআত তরক করলে কী পরিমাণ ছওয়াব ও বরকত থেকে আমরা বঞ্চিত হবো তা ভেবে দেখা উচিৎ। উল্লেখ্য, জামাআতে নামায পড়ার এই ফজিলত শুধু পুরুষের জন্য। হাদীস শরীফে স্পষ্ট এসেছে, মহিলার জন্য মসজিদে নামায পড়ার চেয়ে ঘরে নামায পড়া অধিক উত্তম ও ফজিলতপূর্ণ।’

খুশুখুজুর গুরুত্ব

খুশুখুজুর সঙ্গে নামায পড়ার মতলব হলো, যখন নামাযে দাঁড়াবে তখন আল্লাহ তাআলাকে বিশেষভাবে ‘হাজির-নাযির’ জ্ঞান করবে। আল্লাহ তাআলার মহব্বতে দেহমন আপ্লুত করে তুলবে এবং অন্তরাত্মায় তাঁর বড়ত্ব ও মহত্বের সম্মুখে নিজেকে মিটিয়ে দেয়ার অনুভূতি জাগ্রত রাখবে। যেন আমি এক মহা অপরাধে অপরাধী, ধৃত হয়ে কোনো মহা প্রতাপের অধিকারী বাদশার সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছি! নামাযে দাঁড়িয়ে কল্পনা করবে, আমি মহামহীয়ান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সম্মুখে তাঁরই সম্মানে দাঁড়িয়ে আছি। রুকু করার সময় ভাববে, আমি অবনতশির হচ্ছি আল্লাহ পাকের জালাল ও মহিমার সামনে। নিজেকে সিজদায় নিক্ষেপ করার সময় অনুভবের চেষ্টা করবে, আল্লাহ জাল্লা জালালুহুর অশেষ অসীম কুদরত ও ইজ্জতের সামনে আমি আমার অস্তিত্বের সমস্ত অপারগতা ও অপদস্ততার বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছি। নামাযে যা কিছু পড়া হয়, তা বুঝে বুঝে পড়তে পারলে খুবই ভালো। এতে নামাযের আসল স্বাদ অনুভব করা সহজ হয়, খুশুখুজু পয়দা হয়। নামাযের রুহ বা প্রাণ হলো হৃদয়ের আল্লাহমুখিতা ও খুশুখুজু। এমন নামায যে বান্দার নসীব হবে, সে সুনিশ্চিতভাবে কামিয়াব ও সফল। আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন,

‘ঐ সকল মুমিন সফল ও কামিয়াব, যারা খুশুখুজুর সঙ্গে নিয়মিত নামায আদায় করে।’

এক হাদীসে নবীজী ইরশাদ করেন-

‘পাঁচটি নামায আল্লাহ ফরজ করেছেন। যে ব্যক্তি যথানিয়মে অজু করবে এবং যথাসময়ে নামায আদায় করবে, উত্তমরূপে রুকু সিজদা করবে এবং খুশুখুজুর সঙ্গে নামাযগুলি পড়ে যাবে, তার জন্য আল্লাহ তাআলার ওয়াদা রয়েছে, তিনি অবশ্যই তাকে ক্ষমা করে দিবেন। কিন্তু যে ব্যক্তি যথাযথভাবে নামায আদায় করবে না তার জন্য আল্লাহ পাকের কোনো ওয়াদা নেই। চাইলে তাকে তিনি শাস্তি দিতে পারেন, ক্ষমাও করতে পারেন।’

আমরা যদি আল্লাহ পাকের ক্ষমা পেতে চাই, আখেরাতের শাস্তি থেকে বাঁচতে চাই, তাহলে উত্তম থেকে উত্তমরূপে নামায আদায় করা আমাদের একান্ত কর্তব্য।

নামায পড়ার সংক্ষিপ্ত নিয়ম

যখন নামাযের সময় হবে, তখন ভালোভাবে অজু করে নিবে। মনে মনে ভাববে, আল্লাহ তাআলার দরবারে হাজির হওয়ার জন্য এবং তাঁর ইবাদত ও বন্দেগীর জন্য আমি পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতা অর্জন করছি। এর ভিতরও অনেক রহমত ও বরকত নিহিত আছে। এক হাদীসে এসেছে, ‘অজুর সময় যে অঙ্গগুলো ধৌত করা হয়, সে অঙ্গগুলোর গোনাহ অজুর দ্বারাই মাফ হয়ে যায়। অজুর পানি দ্বারা গোনাহের ছাপ-চিহ্নও ধুয়েমুছে পরিষ্কার হয়ে যায়।’ অজুর পর যখন নামাযে দাঁড়াবে তখন ধ্যান করবে, আমি গোনাহগার। আমি এখন এমন এক সর্বজ্ঞাতা মালিকের সামনে দাঁড়াচ্ছি, যিনি আমার ভিতর-বাহির, প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সকল বিষয় সম্পর্কে সুপরিজ্ঞাত। কেয়ামতের দিন আবার আমাকে তাঁর সামনে দাঁড়াতে হবে। এরপর যে ওয়াক্তের নামাজের জন্য দাঁড়িয়েছে, সে ওয়াক্তের নামাজের নিয়ত করবে। নিয়মমত কান পর্যন্ত হাত তুলে হৃদয়ের গভীর থেকে বলবে, ‘আল্লাহু আকবার’। অতঃপর হাত বাঁধবে এবং আল্লাহ তাআলার দরবারে হাজির হওয়ার পরিপূর্ণ ধ্যান রেখে পাঠ করবে,

سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ وَتَبَارَكَ اسْمُكَ وَتَعَالَى جَدُّكَ وَلَا إِلَهَ غَيْرُكَ

‘হে আল্লাহ। তুমি পূতপবিত্র, চির প্রশংসার্হ, তোমার নাম পরম বরকতময়। তোমার মর্যাদা বড় মহিমাময়। তুমি ব্যতীত কোনো মা’বুদ নেই।’

أَعُوْذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيم

‘বিতাড়িত শয়তান থেকে আমি আল্লাহ তাআলার আশ্রয় গ্রহণ করছি।’

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ

‘পরম করুণাময় চির মেহেরবান আল্লাহর নামে শুরু করছি।’

الْحَمْدُ للهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ(1) الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ (2) مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ (3) إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ (4) اِهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ (5) صِرَاطَ الَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ (6) غَيْرِالْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ وَلَا الضَّالِّينَ (7)

‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার। যিনি জগৎসমূহের প্রতিপালক, সকলের প্রতি দয়াবান, পরম দয়ালু। যিনি কর্মফল দিবসের মালিক। (হে আল্লাহ!) আমরা তোমারই ইবাদত করি, তোমার কাছেই সাহায্য চাই। তুমি আমাদেরকে সরল পথে পরিচালিত করো। সেই সকল লোকের পথে, যাদের প্রতি তুমি অনুগ্রহ করেছো; ঐ সকল লোকের পথে নয়, যাদের উপর তোমার গজব পতিত হয়েছে এবং তাদের পথেও নয়, যারা পথহারা হয়েছে। (হে আল্লাহ! তুমি আমার এই দোয়া কবুল করে নাও)।’

এরপর কোনো সূরা: বা তার অংশ বিশেষ তেলাওয়াত করবে। এখানে আমরা ছোট ছোট চারটি সূরা: উল্লেখ করছি: ১। সূরা: আছর

وَالْعَصْرِ إِنَّ الْإِنْسَانَ لَفِي خُسْرٍ إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ.

‘কালের শপথ! বস্তুত সকল মানুষ মারাত্মক ক্ষতির মধ্যে আছে। তবে তাদের কথা ভিন্ন, যারা ঈমান এনেছে, সৎকর্ম করছে এবং একে অন্যকে সত্যের ও ধৈর্য্যের উপদেশ দিচ্ছে।’

২। সূরা: ইখলাস

قُلْ هُوَ اللهُ أَحَدٌ اَللهُ الصَّمَدُ لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ

‘বলুন, আল্লাহ তাআলা (সর্বদিক থেকে) এক অদ্বিতীয়। আল্লাহ পাক এমন যে, সকলে তার মুখাপেক্ষী: তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন। তাঁর কোনো সন্তান নেই, তিনিও কারো সন্তান নন, তাঁর কোনো সমকক্ষ নেই।’

৩। সূরা: ফালাক

قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ، وَمِنْ شَرِّ غَاسِقٍ إِذَا وَقَبَ وَمِنْ شَرِ النَّفَّاثَاتِ فِي الْعُقَدِ وَمِنْ شِرِّ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ.

‘বলুন, আমি ভোরের মালিকের আশ্রয় গ্রহণ করছি; তিনি যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট থেকে; অন্ধকার রাতের অনিষ্ট থেকে, যখন তা ছেয়ে যায়; সেই সব নারীর অনিষ্ট থেকে, যারা সুতার গিরায় ফুঁ মারে; হিংসুকের হিংসা হতে, যখন সে হিংসা করতে থাকে।’

৪। সূরা: নাস

قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ مَلِكِ النَّاسِ إِلَهِ النَّاسِ مِنْ شَرِّ الْوَسْوَاسِ الْخَنَّاسِ الَّذِي يُوَسْوِسُ فِي صُدُورِ النَّاسِ مِنَ الْجِنَّةِ وَالنَّاسِ

‘বলুন, আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি সমস্ত মানুষের অধিপতির, সমস্ত মানুষের মা’বুদের- পশ্চাতে আত্মগোপনকারী কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট থেকে, যে মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়; সে জিনদের মধ্য থেকে হোক বা মানুষের মধ্য থেকে।’

মোটকথা সূরা: ফাতেহা পড়ার পর একটি সূরা: বা তার কিয়দংশ পাঠ করবে। প্রত্যেক নামাযে এতটুকু তেলাওয়াত করা জরুরি। কেরাত- শেষে আল্লাহ পাকের বড়ত্ব ও মহত্বের ধ্যান করে দিল থেকে আল্লাহু আকবার উচ্চারণ করবে এবং রুকুতে যাবে। আর বারবার বলতে থাকবে, অন্তত তিনবার বলবে,

سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيمُ

পূত-পবিত্র আমার মহান মালিক।

سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيمُ

পূত-পবিত্র আমার মহীয়ান প্রতিপালক।

سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيمُ

পূত-পবিত্র আমার আল্লাহ তাআলা।

এরপর মাথা তুলে সোজা হয়ে দাঁড়াবে এবং বলবে,

سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَه

‘আল্লাহ সেই বান্দার কথা শুনছেন ও কবুল করেছেন যে তাঁর প্রশংসা ও স্তুতি বর্ণনা করছে।’

তারপর বলবে,

رَبَّنَا لَكَ الْحَمْدُ

‘প্রশংসা তোমার হে পরওরদেগার।’

অতঃপর অন্তর থেকে আল্লাহু আকবার বলে সিজদায় লুটিয়ে পড়বে। একে একে দুটি সেজদা করবে। আল্লাহ পাকের সামনে মন ও প্রাণের গভীরতম প্রদেশ থেকে বলতে থাকবে,

سُبْحَانَ رَبِّي الْأَعْلَى

আমি আমার মহান প্রভুর পবিত্রতা ঘোষণা করছি

سُبْحَانَ رَبِّيَ الْأَعْلَى

আমি আমার মহান প্রতিপালকের পবিত্রতা বর্ণনা করছি

سُبْحَانَ رَبِّيَ الْأَعْلَى

আমি আমার মহান মালিকের সুচিশুভ্রতার ঘোষণা দিচ্ছি

সিজদা অবস্থায় ‘সুবহানা রাব্বিয়াল আ’লা’ পড়বে আর নিজের ক্ষুদ্রতা ও অক্ষমতার কথা চিন্তা করতে থাকবে এবং আল্লাহ পাকের অসীম অশেষ বড়ত্ব ও বিশালত্বের ধ্যানে মগ্ন থাকবে। এই চিন্তা ও ধ্যান যত গভীর হবে, নামাযও ততো জানদার ও প্রাণবন্ত হবে।

এ-গেলো এক রাকাআতের বিবরণ। সামনে যত রাকাআত পড়বে, এ-নিয়মেই পড়বে। তবে ‘সুবহানাকা আল্লাহুম্মা’ শুধু প্রথম রাকাতে পড়বে। আর নামাযের মাঝখানে বা শেষে যখন বসবে, তখন ‘আত্তাহিয়্যাতু’ পড়বে। এই দোয়ার ভিতর নামাযের সারমর্ম গচ্ছিত আছে,

التَّحِيَّاتُ لِلَّهِ وَالصَّلَوَاتُ وَالطَّيِّبَاتُ السَّلَامُ عَلَيْكَ أَيُّهَا النَّبِيُّ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهِ السَّلَامُ عَلَيْنَا وَعَلَى عِبَادِ اللَّهِ الصَّالِحِينَ أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُ وَرَسُولُه

‘সমস্ত আদব ও সম্মান, সাদাকা ও ইবাদত আল্লাহ তোমার জন্য। তোমার প্রতি হে রাসূল। আল্লাহর রহমত, বরকত ও সালাম বর্ষিত হোক। শান্তি বর্ষিত হোক আমাদের সকলের উপর এবং আল্লাহ পাকের সকল নেক বান্দার উপর। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ তাআলা ব্যতীত ইবাদতের উপযুক্ত আর কোনো মা’বুদ নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।’

তিন রাকাআত ও চার রাকাআত বিশিষ্ট নামাযে প্রথম দুই রাকাআতের পর বসতে হয়। সেখানে শুধু ‘আত্তাহিয়্যাতু’ পড়বে। আর নামাযের শেষ বৈঠকে ‘আত্তাহিয়্যাতুর পর দরুদ শরীফ পড়বে

اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ

‘হে আল্লাহ! নবীজী ও তাঁর আপনজনদের উপর বিশেষ রহমত নাযিল করো, যেমন রহমত নাযিল করেছো হযরত ইবরাহীম ও তাঁর পরিবার - পরিজনের উপর। আল্লাহ! নিশ্চই তুমি মহিমান্বিত ও প্রশংসিত। বরকত নাযিল করো হে আল্লাহ! নবীজী ও তাঁর আপনজনদের উপর, যেমন তুমি বরকত অবতীর্ণ করেছো হযরত ইবরাহীম ও তাঁর পরিবার-পরিজনের উপর। আল্লাহ! তুমি বড় মহিমান্বিত ও প্রশংসিত।’

দরুদ শরীফ মূলত নবীজী, তাঁর পরিবার-পরিজন ও আপনজনদের জন্য রহমত ও বরকতের দোয়া বিশেষ। যেহেতু নবীজীর মাধ্যমেই দ্বীনের নেয়ামত ও নামাযের এ দৌলত আমরা লাভ করেছি, তাই আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য দরুদ শরীফ দান করেছেন। সুতরাং নবীজীর অনুগ্রহ স্মরণ করে আত্তাহিয়্যাতু পড়ার পর হৃদয় থেকে দরুদ পাঠ করবে। নবীজীর ‘জন্য রহমত ও বরকতের দোয়া করবে। তারপর নিজের জন্য এই দোয়াটি পাঠ করে সালাম ফিরাবে,

اللَّهُمَّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي ظُلْمًا كَثِيرًا، وَلَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنتَ فَاغْفِرْ لِي مَغْفِرَة مِنْ عِنْدِكَ وَارْحَمْنِي إِنَّكَ أَنتَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ.

‘আয় আল্লাহ! আমি তোমার ইবাদত ও আনুগত্যে অবহেলা করে নিজের উপর বহু অন্যায় করেছি। আর তুমি ছাড়া তো মার্জনাকারী কেউ নেই। সুতরাং একান্তই আপন অনুগ্রহে আমাকে ক্ষমা করো। আমার প্রতি দয়া করো মালিক, তুমি বড় ক্ষমাশীল, তুমি বড় দয়ালু।’

এই দোয়ায় নামাযে হয়ে যাওয়া ত্রুটিবিচ্যুতির স্বীকারোক্তি রয়েছে, আল্লাহ তাআলার রহমত ও ক্ষমা লাভের সকাতর প্রার্থনা রয়েছে। মূলত একজন বিনয়ী বান্দার জন্য এটাই শোভনীয় যে, নামাযের মতো ইবাদত করার পরও নিজেকে গোনাহগার ভাববে। অহংকারের তো প্রশ্নই আসে না, বরং নিজের নামাযকে ত্রুটিপূর্ণ মনে করে লজ্জিত থাকবে। নামায কবুল হওয়ার ব্যাপারে কেবলই আল্লাহ তাআলার রহমতের উপর ভরসা করবে। কারণ, আল্লাহ তাআলার ইবাদতের হক আদায় করা বান্দার পক্ষে কখনোই সম্ভব নয়। হে আমার ভাই!নামায হলো পরশপাথরের মতো একটি ইবাদত। উল্লিখিত পদ্ধতিতে ধ্যান ও খুশুখুজুর সঙ্গে যে ব্যক্তি নামায আদায় করবে, নামাযই তাকে আমলে-আখলাকে ফেরেশতাতুল্য বানিয়ে তুলবে। উম্মতের নামাযের বিষয়ে নবীজীর এত ফিকির ছিলো যে, দুনিয়ার জীবনের শেষ মুহূর্তেও উম্মতকে নামায কায়েমের অসিয়ত করে গেছেন। সুতরাং যে সকল ভায়েরা নামায পড়েন না, নামায কায়েমের চেষ্টা করেন না, তারা আল্লাহর ওয়াস্তে ভেবে দেখুন, কেয়ামতের দিন কীভাবে নবীজীর সামনে দাঁড়াবেন, নবীজীকে মুখ দেখাবেন! আপনি তো নবীজীর শেষ অসিয়তকেও আমলে নিচ্ছেন না। আসুন আমরা সবাই ইবরাহীম আলাইহিস সালামের ভাষায় দোয়া করি,

رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلاةِ وَمِنْ ذُرِّيَّتِي رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَاءَ رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُوْمُ الْحِسَابِ.

‘হে আমার আল্লাহ! আমাকে এবং আমার বংশধরদেরকে নামাযী বানিয়ে দাও। হে আমাদের মালিক! আমার এ দোয়া তুমি কবুল করে নাও। ও আমাদের প্রভু! আমাকে, আমার মাতাপিতাকে এবং সকল ঈমানদারকে কেয়ামতের দিন তুমি ক্ষমা করে দিও।’

(ইসলাম কিয়া হ্যাঁয় : মাওলানা মুহাম্মদ মনযূর নোমানী রহ. ,মাকতাবাতুল আযহার থেকে অনূদিত)

যাকাত আদায় করা

ইসলামের বুনিয়াদি ও মৌলিক শিক্ষাগুলোর মধ্যে কালিমা ও নামাযের পরই যাকাতের অবস্থান। যাকাত ইসলামের তৃতীয় রোকন বা খুঁটি। যে মুসলমানের নিকট নির্ধারিত পরিমাণ ধনদৌলত থাকবে, সে প্রতিবছর হিসাব করে সম্পদের শতকরা আড়াই ভাগ গরিব-মিসকীনকে দিয়ে দিবে। এ সম্পর্কিত মাসআলা-মাসাঈল আলেমদের থেকে জেনে নেয়া আবশ্যক। কোরআন শরীফের বহু জায়গায় নামাযের সঙ্গে যাকাতের কথা এসেছে। যদি আপনি তেলাওয়াত করে অভ্যস্ত থাকেন তাহলে বিষয়টি আপনারও গোচরীভূত হয়ে থাকবে। আল্লাহ তা’আলা বার বার বলেছেন,

‘নামায পড়ো, যাকাত দাও।’

কয়েকটি আয়াতে তো নামায ও যাকাতকে মুমিন-মুসলমানের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য বলেও উল্লেখ করা হয়েছে,

‘(মুত্তাকী মুসলমান তারা) যারা নামায কায়েম করে, যাকাত আদায় করে।’

বোঝা গেল, যে ব্যক্তি যাকাত আদায় করে না, সে প্রকৃত মুসলমান নয়। কেননা প্রকৃত মুসলমানের ভেতর যে গুণাবলী থাকা উচিৎ, তার মাঝে সেই গুণাবলী নেই। মোটকথা নামায না পড়া যেমন কাফের-মুশরিকের বৈশিষ্ট্য, মুমিন-মুসলমানের নয়, ইরশাদ হচ্ছে,

‘নামায আদায় করে যাও, নামায ছেড়ে দিয়ে মুশরিকের দলভুক্ত হয়ে যেও না।’

তেমনি যাকাত আদায় না করাও কাফের মুশরিকের বৈশিষ্ট্য; মুত্তাকী মুসলমানের নয়। আল্লাহ পাক বলেন,

‘মুশরিকদের জন্য অশুভ পরিণাম, যারা যাকাত আদায় করে না, আসলে এরা পরকাল-বিশ্বাসীই নয়।’

যাকাত অনাদায়ে শাস্তি

যারা যাকাত আদায় করে না, কেয়ামতের দিন তাদের কী কঠিন শাস্তি হবে, তা শুনলেই গা শিউরে উঠে, হৃদয় কেঁপে উঠে। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন,

‘যারা স্বর্ণরৌপ্য তথা ধনসম্পদ কুক্ষিগত করে রাখে, আল্লাহর রাস্তায় খরচ করে না (যাকাত আদায় করে না, হে রাসূল!) আপনি তাদেরকে সেই দিনের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সংবাদ দিয়ে দিন, যেদিন স্বর্ণরৌপ্য জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করে তাদের চোয়ালে, পৃষ্ঠে ও পার্শ্বে দাগানো হবে। আর বলা হবে, এতো সেই সোনারূপা, যা তোমরা কুক্ষিগত করে রাখতে। সুতরাং আজ সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখার মজা দেখো!’

একটি হাদীসে আয়াতের এ বিষয়বস্তু আরো বিস্তারিতভাবে এসেছে,

‘যে ব্যক্তির নিকট সোনারূপা আছে, কিন্তু সে এর হকসমূহ আদায় করে না (যাকাত দেয় না), কেয়ামতের দিন সেই স্বর্ণরৌপ্য দিয়ে পাত বানানো হবে। এরপর দোযখের আগুনে তা পুড়িয়ে উত্তপ্ত করে তার পিঠে, পার্শ্বে ও কপালে দাগ দেওয়া হবে। কেয়ামত সংগঠিত হওয়ার পুরো সময়টাতে এই আযাব চলতে থাকবে তার উপর। আর এ সময়ের দৈর্ঘ্য হবে পঞ্চাশ হাজার বছর।’

কিছু হাদীসে এ ছাড়াও বিভিন্ন প্রকার কঠিন শাস্তির কথা এসেছে। আল্লাহ পাক আমাদের সকলকে তাঁর আযাব ও গজব থেকে হেফাজত করুন। আসলে আল্লাহ তা’আলা যাকে স্বচ্ছল ও বিত্তবান বানিয়েছেন, সে যদি যাকাত না দেয়, আল্লাহর দেখানো পথে খরচ না করে, তবে নিঃসন্দেহে সে বড় নিমকহারাম ও জালেম। কেয়ামতের দিন যত কঠিন শাস্তিই তাকে দেয়া হোক, সেটা তার জন্য যথার্থই হবে।

বড় একটি জুলুম ও নাশোকরি

তাছাড়া ভাবার বিষয় হলো, যাকাত প্রদানের মাধ্যমে তো আপন সমাজেরই গরিব-দুঃখী মানুষের সেবা করা হয়। সুতরাং যাকাত আদায় না করার দ্বারা দুঃখী-দরিদ্র মানুষের হক ও অধিকার পদদলিত করা হয়। দ্বীনী ভাই ও বোন! একটু চিন্তা করুন, আপনার দখলে যে ধনসম্পদ আছে, সে তো আল্লাহ পাকেরই দান, আবার আমরা নিজেরাও তো আল্লাহর সৃষ্টি, তাঁরই গোলাম- বান্দা ও বান্দী। তিনি যদি সমস্ত সম্পদ ও টাকা-পয়সা তলব করেন এমনকি যদি জীবনটাও দিয়ে দিতে বলেন, তাহলেও তো আমাদের কোনো প্রকার দ্বিধা না করে সব কিছু তাঁর নামে উৎসর্গ করে দেয়া উচিৎ। সেখানে আল্লাহ পাক অতিরিক্ত সম্পদের মাত্র চল্লিশ ভাগের এক ভাগ (শতকরা আড়াই ভাগ) দিতে বলেছেন। এটা তো আমাদের প্রতি আল্লাহ পাকের বড় করুণা এবং অনুগ্রহ। সুতরাং আল্লাহ পাকের এই বিধান পালনে শৈথিল্য প্রদর্শন করা বড়ই নাশোকরি ও অন্যায়।

যাকাতের সওয়াব ও ফজিলত

তদুপরি আল্লাহ তা’আলার অসীম দয়া যে, তিনি যাকাত আদায়কারীকে অনেক অনেক সওয়াব ও নেকী দানের ফায়সালা করেছেন। অথচ এখানে বান্দার কোনো প্রাপ্য ছিলো না। কারণ বান্দা যা দান করছে, তাতো আল্লাহ পাকেরই। তিনি এর বিনিময়ে কোনো সওয়াব না দিলে অন্যায় কিছু হতো না। কিন্তু আমাদের আল্লাহ বড় দয়ালু, তাঁর দেয়া মাল থেকে যখন কোনো কিছু আমরা দান করি, তখন তিনি খুবই খুশী হন, অনেক অনেক নেকী ও সওয়াব দান করেন। আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন,

‘যারা আল্লাহর রাস্তায় মাল খরচ করে, তাদের খরচকৃত জিনিসের উদাহরণ হলো ঐ শষ্যদানার মতো, যে দানা থেকে সাতটি শীষ উদগত হয়, যে শীষগুলির প্রত্যেকটিতে থাকে আবার একশ করে দানা। আর আল্লাহ যাকে চান তাকে এর চেয়েও বেশী দান করেন। তিনি সব ধরণের স্বচ্ছলতার অধিকারী, সর্ব বিষয়ে সম্যক অবগত।’

অন্য আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন,

‘যারা আল্লাহর পথে ব্যয় করে এবং ব্যয় করার পর খোটা বা কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকে, তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের নিকট মহাপুরস্কার অপেক্ষা করছে। তারা আগত পরিস্থিতিতে ভীতসন্ত্রস্ত হবে না এবং বিগত কিছুর জন্য তারা দুঃখিত হবে না।’

এই আয়াত: দুটিতে আল্লাহ পাক দান-খয়রাতকারীর জন্য তিনটি ওয়াদা করেছেন, ১। যত দান করবে, আল্লাহ তা’আলা তাকে এর শতগুণ বেশী বরকত দুনিয়াতেই দান করবেন। ২। আখেরাতে তাকে অনেক বড় সওয়াব ও নেয়ামত দান করবেন। ৩। কেয়ামতের দিন তার কোনো শংকা-ভয় এবং দুঃখ-দুশ্চিন্তা থাকবে না। সুবহানাল্লাহ।

আমার ভাই ও বোন! এই সকল ওয়াদার উপর সাহাবায়ে কেরামের একীন ছিলো, বিশ্বাস ছিলো। তাদের ঈমানের অবস্থা এমন ছিলো যে, যখন দান-খয়রাতের ফজিলতের উপর কোনো আয়াত: নাযিল হতো আর নবীজীর যবান মোবারক থেকে সেই বিবরণ তারা শুনতেন, তখন গরীব সাহাবীরা বাজারের দিকে ছুটে যেতেন। কুলিগিরি করে পিঠে বোঝা বয়ে দু’চার পয়সা যা পেতেন তাই আল্লাহর রাস্তায় সদকা করে দিতেন। যাকাত দানের ফজিলত সম্পর্কে একটি হাদীসে এসেছে- তিনটি বিষয় যে ব্যক্তি গ্রহণ করবে, সে ঈমানের মজা ও স্বাদ পেতে থাকবে: ১। একমাত্র আল্লাহ তা’আলার ইবাদত করা। ২। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর উপর সত্যিকারের ঈমান আনা ও বিশ্বাস রাখা। ৩। প্রতি বছর স্বতস্ফূর্তভাবে আপন মালের যাকাত আদায় করা।’

আল্লাহ পাক আমাদের সকলকে ঈমানের মজা ও স্বাদ নসীব করুন।

দান-খয়রাতের দুনিয়াবি ফায়দা

যাকাত-সদকা এবং অন্যান্য দান-খয়রাতের অনেক বড় বড় দুনিয়াবি ফায়দাও রয়েছে। যে ব্যক্তি দান-খয়রাত করে, সে তার আত্মায় এক অভূতপূর্ব আনন্দ এবং অলৌকিক প্রশান্তি লাভ করে। দরিদ্র মানুষের সহিংস দৃষ্টি থেকে সে রক্ষা পায়, বরং দরিদ্র মানুষেরা তার কল্যাণ কামনা করতে থাকে, তাকে ভালোবাসে। জনসাধারণের হৃদয়ে তার মর্যাদাপূর্ণ আসন তৈরি হয়। বিপদে-আপদে সকলের সহযোগিতা সে লাভ করে। আল্লাহ পাকও তার ধনদৌলতে বরকত দান করেন। একটি হাদীসে নবীজী ইরশাদ করেন,

‘আল্লাহ তা’আলা আদম-সন্তানকে ডেকে বলেন, হে বনি আদম। আমার দেয়া মাল অভাবী মানুষের অভাব মোচনে, জনকল্যাণমূলক কাজে ও ধর্মীয় প্রয়োজনে খরচ করে যাও, আমিও তোমাকে অবিরাম দিতে থাকব।’

অন্য একটি হাদীসে নবীজী বলেন,

‘আমি কসম করে বলতে পারি, দান সদকা করার কারণে কেউ কোনো দিন নিঃস্ব-ফকির হয়ে যায় না।’

আল্লাহ পাক আমাদেরকে এই সকল হাদীসের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস ও একীন হাসিল করার এবং স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে দান-সদকা করার তাওফীক দান করুন, আমীন।

(ইসলাম কিয়া হ্যাঁয় : মাওলানা মুহাম্মদ মনযূর নোমানী রহ. ,মাকতাবাতুল আযহার থেকে অনূদিত)

ইসলামের বুনিয়াদি শিক্ষাগুলোর মাঝে কালিমা, নামায ও যাকাতের পর রোযার অবস্থান। আল্লাহ পাক বলেন,

‘হে ঈমানদারগণ, তোমাদের উপর রোযা রাখা ফরজ যেমন, ফরজ ছিলো তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর।’

পুরো রমযান মাস রোযা রাখা ফরজ। যে ব্যক্তি বিশেষ অপরাগতা বা অক্ষমতা ব্যতীত রমজানের একটি রোযাও ছেড়ে দিবে ,সে কঠিন গোনাহগার হবে। একটি হাদীসে এসেছে,

‘যে ব্যক্তি কোনো রোগ-বালাই কিংবা বিশেষ কোনো ওজর ব্যতীত রমযানের একটি রোযাও তরক করলো, সে যদি তদস্থলে সারা জীবনও রোযা রাখে, তবু রমযানের ঐ একটি রোযার হক আদায় হবে না।’

রোযার সওয়াব

রোযার ভিতর ইবাদতের নিয়তে খানাপিনা ও কামক্রিয়া থেকে বিরত থাকতে হয় এবং আল্লাহর ওয়াস্তে আপন ইচ্ছা ও জৈবিক চাহিদা বিসর্জন দিতে হয়। এ জন্য আল্লাহ পাক এই ইবাদতের অন্যরকম সওয়াব এবং অনেক বেশী নেকী দান করেন। হাদীসে এসেছে,

‘বান্দার সকল নেক আমলের সওয়াব দানের জন্য একটি নিয়ম বা স্কেল থাকে। প্রত্যেক নেক আমলের সওয়াব সেই অনুসারে দেয়া হয়। কিন্তু রোযার বিষয়টি সাধারণ স্কেল ও নীতির উর্ধ্বে। আল্লাহ পাক বলেন, বান্দা আমার জন্যই খাদ্য- পানীয় বিসর্জন দিয়েছে, কামক্রিয়া বর্জন করেছে, সুতরাং সরাসরি আমি নিজে তাকে বিশেষ আজর ও সওয়াব দান করবো।’

অন্য এক হাদীসে এসেছে

‘যে ব্যক্তি পূর্ণ ঈমান ও একীনের সঙ্গে আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি ও সওয়াবের আশায় রমযানের রোযা রাখবে, আল্লাহ পাক তার পূর্বের সকল গোনাহ মাফ করে দিবেন।’

অপর একটি হাদীসে নবীজী ইরশাদ করেন,

‘রোযাদারের আনন্দ ও খুশির মওকা দুটি। একটি লাভ হয় এ দুনিয়াতে ইফতার করার সময়। আর অন্যটি লাভ হবে আল্লাহ পাকের সামনে হাজির হওয়ার এবং তার নৈকট্যের সম্মান লাভের সময়।’

আরেকটি হাদীসে এসেছে-

‘রোযা হলো জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার শক্ত ঢাল এবং সুরক্ষিত দুর্গ বিশেষ।

এক হাদীসে এসেছে,

‘খোদ রোযাই রোযাদারের জন্য সুপারিশ করে বলবে, আমার কারণে এ বান্দা খাদ্য-পানীয় স্পর্শ করেনি, জৈবিক চাহিদা পূরণের চেষ্টা করেনি (সুতরাং হে আল্লাহ! তুমি এ বান্দাকে ক্ষমা করে দাও, তাকে পরিপূর্ণ প্রতিদান দিয়ে দাও) আল্লাহ তা’আলা রোযার সুপারিশ কবুল করে নেবেন।’

‘পেট খালি হওয়ার কারণে মাঝে মাঝে রোযাদারের মুখে যে গন্ধ উঠে আসে, আল্লাহ পাকের নিকট তা মৃগনাভীর চেয়েও প্রিয়।’

হাদীসগুলিতে রোযার যে ফজিলত এসেছে, তাছাড়াও উল্লেখযোগ্য একটি ফজিলত ও বৈশিষ্ট্য এই যে, রোযা পশুবৃত্তি থেকে মানব প্রকৃতিকে আলাদা রাখতে উদ্বুদ্ধ করে। যখনই ইচ্ছে খাওয়া, ইচ্ছে হলেই পান করা বা কামক্রিয়ায় জড়িয়ে পড়া-এটা পশুর স্বভাব। আর এসব বিষয়ে মোটেই না জড়ানো হলো ফেরেশতার স্বভাব। মানুষ রোযা রাখার মাধ্যমে পশুত্ব থেকে উঠে এসে ফেরেশতার সাদৃশ্য অবলম্বন করে। তার ভিতর আত্মনিয়ন্ত্রণ ও পরিমিতিবোধ জেগে ওঠে।

রোযার বিশেষ ফায়দা

রোযার বিশেষ ফায়দা হলো, এর মাধ্যমে তাকওয়া, খোদাভীতি ও পরহেযগারীর গুণ সৃষ্টি হয়, শাহওয়াত ও প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণে আনার শক্তি অর্জিত হয়। আল্লাহ পাকের হুকুমের মোকাবেলায় নফসের কামনা ও খাহেশকে উপেক্ষা করার সদভ্যাস গড়ে ওঠে এবং আত্মার জগতের উন্নতি ও শ্রীবৃদ্ধি ঘটে। কিন্তু এ-সকল ফায়দা তো তখনি হবে, যখন রোযাদার নিজেও এগুলো অর্জনে সচেষ্ট হয়ে রোযা অবস্থায় পালনীয় নবীজীর অন্যান্য হেদায়েত ও নির্দেশনাগুলোর প্রতি লক্ষ্য রাখবে। ছোট বড় সকল গোনাহ থেকে বাঁচবে, মিথ্যা বলবে না, পরনিন্দায় জড়াবে না, ঝগড়াঝাটিতে লিপ্ত হবে না। অর্থাৎ সকল প্রকার প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য গোনাহ থেকে দূরে থাকবে। এক হাদীসে এসেছে,

‘তোমাদের কেউ যখন রোযা রাখবে, তখন দিনের বেলা সে যেন মুখে কোনো অশ্লীল কথা না বলে, হৈ চৈ না করে। গায়ে পড়ে কেউ যদি তার সঙ্গে ঝগড়া করতে উদ্যত হয় এবং তাকে গালিগালাজ করে, তাহলে সে যেন তাকে শুধু এটুকু বলে ক্ষ্যান্ত হয় যে, ‘ আমি রোযাদার। তোমার গালিগালাজের জবাব দিতে পারছি না।

অন্য এক হাদীসে নবীজী বলেন,

‘রোযা রেখেও যে ব্যক্তি মন্দকথা ও কুকর্ম ত্যাগ করবে না, তার এই ক্ষুধাতৃষ্ণা অবলম্বনে আল্লাহ পাকেরও কিছু আসবে যাবে না।ন

আরেকটি হাদীসে এসেছে,

‘কত রোযাদার এমন আছে, মন্দ কাজ থেকে বিরত না থাকার কারণে তাদের রোযা থেকে ক্ষুধাতৃষ্ণার কষ্ট ছাড়া কিছুই অর্জন হয় না।’

মোটকথা, রোযার সুফলগুলো তখনই লাভ হবে, যখন ছোট বড় সকল গোনাহ থেকে আমরা বেঁচে থাকবো। বিশেষত মিথ্যা, পরচর্চা ও গালিগালাজ থেকে জবান হেফাজত করবো। যদি আমরা সঠিকভাবে রোযা রাখি, তবে রোযাই আমাদেরকে ফেরেশতাতুল্য বানিয়ে দিবে ইনশাআল্লাহ।আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে রোযার হাকীকত, গুরুত্ব ও ফজিলত বোঝার তাওফীক দান করুন। রোযার অসিলায় আমাদের অন্তরে তাকওয়া ও খোদাভীতি সৃষ্টি করে দিন।

(ইসলাম কিয়া হ্যাঁয় : মাওলানা মুহাম্মদ মনযূর নোমানী রহ. ,মাকতাবাতুল আযহার থেকে অনূদিত)

‘যারা কাবা ঘরে পৌঁছার সামর্থ্য রাখে, তাদের উপর আল্লাহর জন্য এ ঘরের হজ্ব করা ফরজ। আর কেউ তা পালন করতে অস্বীকার করলে করুক আল্লাহর তাতে কিছু আসবে যাবে না। আল্লাহ সমস্ত জগতবাসী হতে অমুখাপেক্ষী।’

আয়াতটিতে হজ্ব ফরজ হওয়ার ঘোষণা রয়েছে। আর হজ্ব শুধু সামর্থ্যবান লোকদের উপরই ফরজ -এদিকেও ইঙ্গিত রয়েছে, এবং আয়াতের শেষ অংশে ইরশাদ হয়েছে, হজ্ব করার শক্তি-সামর্থ্য থাকার পরও আজকাল অনেক ধনী যারা হজ্ব করে না, তাদের এই অন্যায় আচরণে আল্লাহ পাকের কোনো ক্ষতি হয় না। আল্লাহ তো মুখাপেক্ষিতার দোষ থেকে মুক্ত, চির অনপেক্ষ। অবশ্য নেয়ামতের এমন না-শোকরি ও বেকদরির কারণে বান্দা নিজেই আল্লাহ পাকের রহমত থেকে বঞ্চিত হয় এবং এর পরিণাম খুবই খারাপ হয়। হাদীস শরীফে এসেছে,

‘কাউকে আল্লাহ পাক হজ্বের সামর্থ্য দান করার পরও যদি সে হজ্ব না করে, বুঝতে হবে, সে ব্যক্তি ইহুদী হয়ে মরুক আর খৃস্টান হয়ে মরুক, এতে যেন তার কোনো পরোয়াই নেই।’

ভাই আমার! যদি অন্তরে ঈমান ও ইসলামের নূন্যতম মূল্য অবশিষ্ট থাকে, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সঙ্গে সামান্য সম্পর্ক যদি অবশিষ্ট থাকে, তবে এই হাদীস জানার পর সামর্থ্যবান কারো জন্যই হজ্ব থেকে উদাসীন থাকা কিছুতেই সঙ্গত হবে না। হজ্বের বরকত ও ফজিলত একটি হাদীসে এসেছে,

‘হজ্ব বা উমরায় গমনকারী হলো আল্লাহ পাকের বিশেষ মেহমান, সে দোয়া করলে আল্লাহ পাক তা কবুল করেন, ক্ষমা প্রার্থনা করলে ক্ষমা করে দেন।’

আরেক হাদীসে এসেছে,

‘যে ব্যক্তি হজ্ব পালন করবে, আর তাতে অভদ্র-অশ্লীল আচরণ থেকে এবং আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতা ও নাফরমানী থেকে বিরত থাকবে, সে ব্যক্তি হজ্ব থেকে এমন নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসবে, জন্মের সময় একটি শিশু যেমন নিষ্পাপ অবস্থায় জন্ম গ্রহণ করে।’

অন্য একটি হাদীসে এসেছে,

‘যে হজ্ব নিষ্ঠার সঙ্গে যথানিয়মে আদায় করা হয় এবং যাতে কোনো প্রকার অনাচার যুক্ত হয় না, সেই ‘হজ্ব-এ-মাবরুরের’ যথাযোগ্য পুরস্কার জান্নাত ছাড়া অন্য কিছুই হতে পারে না।’

হজ্বের নগদ প্রাপ্তি

হজ্বের উসিলায় আখেরাতের ক্ষমা ও জান্নাত তো আমরা পাবোই ইনশাআল্লাহ। কিন্তু আল্লাহ পাকের নূর ও তাজাল্লিতে ভরপুর কাবাঘরের দর্শন লাভের মাধ্যমে এবং হযরত ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম ও নবীজী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর স্মৃতি বিজড়িত মক্কা নগরীতে পৌঁছার মাধ্যমে একজন ঈমানদার যে বিপুল আধ্যাত্যিক সম্পদ এবং ঐশ্বরিক তৃপ্তি ও প্রশান্তি লাভ করে, দুনিয়াতে তার তুলনা কেবল জান্নাতি নেয়ামতের সঙ্গেই হতে পারে, অন্য কিছুর সঙ্গে নয়। মদীনা শরীফে গমন করা, রওজা মোবারকে হাজির হওয়া, নবীজীর দরবারে সরাসরি সালাত ও সালাম পেশ করা, নবীজীর স্মৃতি রোমন্থন করে মহব্বত ও ভালবাসার অশ্রু-সাগরে স্নান করা, মদিনার অলিগলিতে ঘুরে-ঘুরে কখনো হাসা, কখনো কাঁদা, পূন্যভূমির ঘ্রাণময় আলোবাতাশে দিল ও দেমাগ খোশবুদার বানিয়ে নেওয়া-ইত্যাদি হলো একজন হাজীর নগদ প্রাপ্তি, যদি সে তা অনুভব করতে পারে। আসুন! আল্লাহ পাকের দরবারে আমরা মোনাজাত করি, তিনি যেন আপন অনুগ্রহে আমাদেরকে হজ্বের এই স্বাদ ও নেয়ামত নসীব করেন, আমীন।

ইসলামের বুনিয়াদি শিক্ষা পাঁচটি

কালিমা, নামায, যাকাত, রোযা ও হজ্ব। এই পাঁচটি বিষয়কে ‘আরকানে ইসলাম’ বলা হয়। সুপ্রসিদ্ধ একটি হাদীসে নবীজী ইরশাদ করেন,

‘ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি জিনিসের উপর। ১. লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ-একথার সাক্ষ্য দেওয়া। ২. যথাযথভাবে নামায পড়া। ৩. যাকাত আদায় করা। ৪. রমজান মাসের রোযা রাখা। ৫. কাবা শরীফের হজ্ব করা, যদি সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য থাকে।’

এই পাঁচটি বিষয় ইসলামের বুনিয়াদ বা ভিত্তি হওয়ার অর্থ হলো, এগুলি ইসলামের মৌলিক ফরজ। এগুলির উপর ভালোভাবে আমল করার দ্বারা ইসলামের অন্যান্য বিষয়গুলির উপর আমল করার যোগ্যতা অর্জিত হয়। ইতিপূর্বে এই পাঁচটি বিষয়ের গুরুত্ব ও ফজিলত শুধু উল্লেখ করা হয়েছে, কোনো মাসআলা বলা হয়নি। বিস্তারিত মাসআলা-মাসায়েল সংশ্লিষ্ট বিষয়ের নির্ভরযোগ্য কিতাব পড়ে বা মুত্তাকী-পরহেযগার আলিমগণের কাছ থেকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিতে হবে। আল্লাহ পাক আমাদেরকে তাওফীক দান করুন। আমীন

(ইসলাম কিয়া হ্যাঁয় : মাওলানা মুহাম্মদ মনযূর নোমানী রহ. ,মাকতাবাতুল আযহার থেকে অনূদিত)

Under Construction