• Separator
  • যে কোনো বিষয়ে শরীয়ী সমাধান ও পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করুন ডিটা প্রধান কার্যালয় — জামিয়া সুফফাহ শারকিয়া, দারুল ইফতায়।
  • Separator
  • দাওয়াহ, জ্ঞান ও সেবায় সমৃদ্ধ উম্মাহ গড়তে সাথে থাকুন।
  • Separator
  • প্রতি শুক্রবার নিয়মিত ইসলাহী প্রোগ্রাম এবং প্রতি ইংরেজি মাসের দ্বিতীয় শুক্রবার দারুসুল কুরআন প্রোগ্রাম অনুষ্ঠিত হয়—স্থান: সুত্রাপুর, বগুড়া।
  • Separator
  • যে কোনো বিষয়ে শরীয়ী সমাধান ও পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করুন ডিটা প্রধান কার্যালয় — জামিয়া সুফফাহ শারকিয়া, দারুল ইফতায়।
  • Separator
  • যে কোনো বিষয়ে শরীয়ী সমাধান ও পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করুন ডিটা প্রধান কার্যালয় — জামিয়া সুফফাহ শারকিয়া, দারুল ইফতায়।
  • Separator
  • দাওয়াহ, জ্ঞান ও সেবায় সমৃদ্ধ উম্মাহ গড়তে সাথে থাকুন।
  • Separator
  • প্রতি শুক্রবার নিয়মিত ইসলাহী প্রোগ্রাম এবং প্রতি ইংরেজি মাসের দ্বিতীয় শুক্রবার দারুসুল কুরআন প্রোগ্রাম অনুষ্ঠিত হয়—স্থান: সুত্রাপুর, বগুড়া।
  • Separator
  • যে কোনো বিষয়ে শরীয়ী সমাধান ও পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করুন ডিটা প্রধান কার্যালয় — জামিয়া সুফফাহ শারকিয়া, দারুল ইফতায়।

ইসলামের পরিচয়

ইসলাম (اسلام) আরবী শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ অনুগত হওয়া, আনুগত্য করা, আত্মসমর্পণ করা, শান্তির পথে চলা ও মুসলমান হওয়া। 

শরী'আতের পরিভাষায় আল্লাহর অনুগত হওয়া, আনুগত্য করা ও তাঁর নিকট পূর্ণ আত্মসমর্পণ করা।' দ্বিধাহীন চিত্তে তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলা এবং তাঁর দেয়া বিধান অনুসারে জীবনযাপন করা। আর যিনি ইসলামের বিধান অনুসারে জীবনযাপন করেন তিনি হলেন মুসলিম বা মুসলমান।

ইসলাম আল্লাহ্ তা'আলার মনোনীত একমাত্র 'দীন'-একমাত্র পূর্ণাঙ্গ ও পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত এ ব্যবস্থার আলোকে একজন মুসলমানকে জীবনযাপন করতে হয়। ইসলামে রয়েছে সুষ্ঠু সমাজ, রাষ্ট্র ও অর্থব্যবস্থা, রয়েছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নীতিমালা। মানব চরিত্রের উৎকর্ষ সাধন, ন্যায়নীতি ও সুবিচারভিত্তিক শান্তি-শৃংখলাপূর্ণ গতিশীল সুন্দর সমাজ গঠন ও সংরক্ষণে ইসলামের কোনো বিকল্প নেই, হতেও পারে না। 

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন:

إِنَّ الدِّينَ عِندَ اللَّهِ الْإِسْلَامُ

ইসলামই আল্লাহর একমাত্র মনোনীত দীন।

অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে:

وَ مَنْ يُبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ

কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো দীন গ্রহণ করতে চাইলে তা কখনো তার থেকে কবূল করা হবে না 

হাদীস শরীফে ইসলামের একটি সংজ্ঞা ও পরিচিতি সুন্দরভাবে বিবৃত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন:

الإسلام أن تشهد أن لا إلهَ إِلَّا اللهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ وَثَقِيمَ الصَّلَاةَ وَتُؤْلِ الزَّكَاةَ وَتَسُوْمَ رَمَضَانَ وَتَحُجَّ الْبَيْتَ إِنِ اسْتَطَعْتَ إِلَيْهِ سَبِيلًا

ইসলাম হল তোমার এই সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ্ ব্যতীত কোনো ইলাহ্ নেই এবং মুহাম্মাদ (সা) আল্লাহ্র রাসূল, সালাত আদায় করা, যাকাত প্রদান করা, রমযানের রোযা পালন করা এবং যাতায়াতের সামর্থ্য থাকলে বায়তুল্লাহ্ শরীফে হজ্জ আদায় করা।

ইসলামই সকল নবী-রাসূলের অভিন্ন ধর্ম। হযরত আদম (আ) থেকে শুরু করে শেষনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) পর্যন্ত আগমনকারী সকল নবী-রাসূলই মানুষকে ইসলামের দিকেই আহ্বান করেছেন এবং এরই ভিত্তিতে নিজ নিজ উম্মতকে গড়ে তুলেছেন।

ইসলাম ধর্মের মর্ম হল আল্লাহ্ পরিপূর্ণ আনুগত্য করা। আর প্রত্যেক পয়গাম্বরই যেহেতু নিজে আল্লাহর পূর্ণ অনুগত থাকার সাথে সাথে উম্মতকেও তার অনুগত হওয়ার জন্য দাওয়াত দিয়েছেন, তাই সকল নবীর দীনই ইসলাম

ইসলামই একমাত্র পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা

হযরত মুহাম্মদ (সা) আল্লাহ তা'আলার শেষ নবী। কুরআন তাঁর প্রতি নাযিলকৃত আখেরী কিতাব। মহানবী (সা)-এর আগমনের পর পূর্ববর্তী শরী'আত ও কিতাব সবই রহিত হয়ে গেছে। এরপর আর কোনো নবী আসবেন না এবং কোন কিতাবও নাফিল হবে না। যাঁরা এ আকীদা পোষণ করবেন তাঁরা মুসলিম। আর যারা এ আকীদা পোষণ করবে না, তারা অমুসলিম কাফির।

ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। এতে কোন খুঁত নেই, নেই কোনো অপূর্ণতা। আল-কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:

اليومَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمْ إِلَّا سَلَامَ دِينًا

আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীন পূর্ণাঙ্গ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দীন মনোনীত করলাম।

কুরআন মজীদে আরো ইরশাদ হয়েছে।

وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَبَ تِبْيَانًا لَكُلِّ شَيْء

এবং আমি আপনার প্রতি এমন কিতাব নাযিল করেছি যার মধ্যে প্রতিটি বস্তুর স্পষ্ট বর্ণনা বিদ্যমান।

এতে একথা বোঝা যায় যে, মানবজীবনে যা কিছু প্রয়োজন তার সব কিছুর নীতি নির্ধারণী বিবরণ আল-কুরআনে আছে। প্রয়োজনীয় জ্ঞানানুশীলনের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পবিত্র জীবনাদর্শের ভিত্তিতে সবকিছুই নির্ধারণ করতে হবে। মুজতাহিদ ইমামগণ তাঁদের সম্পূর্ণ জীবন ব্যয় করেছেন এই কাজে। মানবজাতির জীবনযাপন পদ্ধতির পরিপূর্ণ ও সুষ্ঠু সমাধান তুলে ধরেছেন তাঁরা বিস্তৃতভাবে। এই জীবনব্যবস্থায় কোনোরূপ অপূর্ণতার কথা চিন্তা করা যায় না। মানুষের ঈমান-আকীদা থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক জীবনের মূলনীতিসমূহ ইসলামে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যা প্রকৃতপক্ষেই পরিপূর্ণ এবং অতুলনীয়। এতে নতুনভাবে কোনো কিছুর সংযোজন বা বিয়োজন করার আদৌ কোনো অবকাশ নেই।

ইসলাম আল্লাহ্ প্রদত্ত এমন এক জীবনব্যবস্থা যা ভারসাম্যপূর্ণ, স্বভাবসম্মত এবং মানবিক সামর্থ্যের উপযোগী।

কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে:

لا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا.

আল্লাহ্ কারো উপর এমন কোনো দায়িত্ব অর্পণ করেন না, যা তাঁর সাধ্যাতীত

ইসলাম শান্তিপূর্ণ, নির্ভেজাল এবং ভারসাম্যপূর্ণ জীবনাদর্শের বাস্তবায়ন ঘটাতে চায়। মানব জীবনের কোনো একটি বিষয় অথবা কোনো একটি দিকের উপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করা এবং স্বাভাবিক ভারসাম্য বিনষ্ট করাকে ইসলাম কোনোক্রমেই সমর্থন করে না। ইবাদত-বন্দেগী, ব্যবসা-বাণিজ্য, লেনদেন, আচার-আচরণ ও আমল-আখলাক তথা জীবনের কোনো স্তরে এমন কিছু করা আদৌ ইসলামসম্মত নয় যা ঈমান ও মানবতার ক্ষতি সাধন করে।

ইসলাম শান্তি ও সম্প্রীতির ধর্ম

ইসলাম শান্তি ও সম্প্রীতির ধর্ম। ইসলাম নিজেদের মত অন্যদেরকেও ভালোবাসতে উদ্বুদ্ধ করে। ইসলাম মানুষকে নিজের, স্বজনের, স্বদেশের তথ্য বিশ্ববাসীর কল্যাণের জন্য সক্রিয় ভূমিকা পালনে ও ত্যাগ স্বীকারের প্রেরণা যোগায়। আর তাতেই বিশ্ববাসীর জীবনধারায় নেমে আসে প্রশান্তি এবং বিদূরিত হয় অশান্তি, হিংসা, বিদ্বেষ এবং হানাহানি। ইসলামের শিক্ষা হল, মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ নাই। সাদা কালো সকল মানুষই আল্লাহর বান্দা। সমগ্র মানবজাতি একই পরিবারভুক্ত। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন:

الخلق عيان الله

সকল সৃষ্টি অল্লাহর পরিবার।

বস্তুত মানবজাতি একটি দেহের মত। কেননা আমরা সকলেই আদম ও হাওয়া (আ)-এর সন্তান।

আল-কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:

হে মানুষ। আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে , পরে তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সে ব্যক্তিত্ব অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে অধিক মুত্তাকী নিশ্চয়ই আল্লাহ সব কিছু জানেন, সমস্ত খবর রাখেন

মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনে প্রাণী ও প্রাকৃতিক সম্পদ আবশ্যক। তাই পৃথিবীতে শান্তি ও সমৃদ্ধির লক্ষে ইসলাম শুধু মানুষের প্রতিই সদয় ব্যবহারের নির্দেশ দেয়নি, উপরন্ত প্রাণির পরিচর্যা, প্রাকৃতিক সম্পদ ও উদ্ভিদের যথার্থ ব্যবহার সম্পর্কেও ইসলাম গুরুত্ব আরোপ করেছে।

রাসুলুল্লাহ(সা) বলেছেন:

الراحمون يرحمهم الرحمن ارحموا من في الْأَرْضِ يرحمكم من في السماء

যারা দয়া করে, দয়াময় আল্লাহ তাদের প্রতি দয়া করেন। তোমরা পৃথিবীবাসীদের প্রতি দয়া কর, তাহলে আকাশবাসী (আল্লাহ) তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।

মোটকথা সমস্ত সৃষ্টি জড়, অজড়, প্রাণী ও প্রকৃতি সকলেই ইসলামের উদারতায় উদ্ভাসিত ইসলাম শুধু বিশ্বাসভিত্তিক ধর্ম নয়। বরং তা বিশ্বাস ও কর্মের এক সুষম সমন্বয়ের বাস্তব অভিব্যক্তি।

ইসলাম নতুন কোন দীন নয়, বরং হযরত আদম আলাইহিস সালামের মাধ্যমে যখন থেকে পৃথিবীতে মানবজীবনের শুরু তখন থেকেই মানুষের জন্য জীবনব্যবস্থারূপে দীনুল ইসলামের শুরু। হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাধ্যমে দীনুল ইসলাম শুধু পূর্ণাঙ্গতা ও সার্বজনীনতা লাভ করেছে এবং পূর্ববর্তী দীন ও শরীয়াতের কার্যকরতা রহিত হয়েছে। এখন আখেরী নবীর উপর নাযিলকৃত কিতাব ও শরীয়ত এবং দীনুল ইসলামই হচ্ছে কেয়ামত পর্যন্ত সর্বযুগের সর্বজাতির নাজাত ও মুক্তির একমাত্র পথ।

সিরাত অর্থ জীবনী । তবে সীরাত বলতে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- এর জীবনীই বোঝানো হয়ে থাকে। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- এর জীবনে যা কিছু ঘটেছে, তার সাথে সম্পৃক্ত, সরাসরি বা পরোক্ষভাবে তার সকল দিক, চারিত্রিক দিক, পারিবারিক জীবন, সামরিক জীবন, এককথায় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- এর সকল দিক সীরাতের অন্তর্ভুক্ত। সীরাতের অধ্যয়ন একটি উত্তম আমল বা সাওয়াবের কাজ, সিরাত পাঠ মুমিনের ঈমানকে মজবুত করে, সিরাত অধ্যয়ন কোরআন বোঝার জন্য সহায়ক, সিরাত অধ্যয়ন হাদীস বোঝার জন্যও সহায়ক, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- এর জীবন মুমিনদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ বা নমুনা। তাই সিরাত পাঠের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।

নবীজির সিরাত কেন পড়বো

মানুষ স্বভাবগতভাবেই অনুকরণপ্রিয়। জন্মলগ্ন থেকেই শিশু অনুকরণ করে তার পিতা মাতাকে। একটু বড় হলে অনুকরণ করে তার খেলার সাথী বা বন্ধু বান্ধবকে। আরো বড় হলে জীবন চলার পথে অনুকরণ করে পছন্দের কোন মানুষকে। এই অনুকরণ-অনুসরণ, একটি মানুষ জন্মলগ্ন থেকেই তার স্বভাব বহন করে থাকে। এখন প্রশ্ন হলো, সত্যিকারার্থে এমন মানুষ আছে কি? যিনি সকলের মানুষের জন্য অনুকরণীয়-অনুসরণীয় হতে পারেন। হ্যাঁ, আছেন।  তিনি হলেন আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। 

মহান আল্লাহ  তাআলা ইরশাদ করেন:

আর নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের উপর অধিষ্ঠিত।

হাদীস শরীফে ইরশাদ রয়েছে, হযরত আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন:

তোমাদের মাঝে কেহ (পূর্ণ) ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান ও সমস্ত মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় না হব।

সীরাত অধ্যয়নে নীতিমালা অনুসরণ

সীরাত বা নবীজীর জীবনচরিত অধ্যয়নের জন্য সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও নীতি রয়েছে। একজন রাসূল ও নবীর জীবনীকে সাধারণ নেতার মতো অধ্যয়ন করা কখনই যৌক্তিক নয়। নবীজীর সীরাত সম্পূর্ণরূপে সংরক্ষিত আছে কুরআন, হাদীস ও ইতিহাসগ্রন্থে। এ সকল উৎসে বর্ণিত সীরাত বিষয়ক ভাষ্য-গুলো নবুওয়াত ও রিসালত ভিত্তিক বোঝার ও ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করাই ছিলো সঠিক নিয়ম ও পদ্ধতি।

কিন্তু মডার্নিস্টরা এখানে ভিন্ন পথে হেঁটেছেন। তারা সীরাত অধ্যয়নে সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি অবলম্বন করেছেন। তারা বর্ণনাভিত্তিক ভাষ্যগুলোকে-কুরআনে থাকুক বা সহীহ হাদীসে-সর্বতোভাবে জাগতিক ও মানবিক যুক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেছেন। তারা সীরাত বোঝার ক্ষেত্রে দ্বন্দ্বাত্নক ও সমালোচনামূলক পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন এবং ব্যাখ্যার জন্য নতুন নতুন আইডিওলজি ও পদ্ধতি আমদানি করেছেন। যেখানে সীরাত নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন ও ভিন্ন বিশ্লেষণ করা হয়েছে । সুতরাং এ বিষয়ে যথাযথ সতর্ক থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন। পাশাপাশি তাঁদের ব্যবহৃত পদ্ধতির যথাযথ খন্ডন ও বিশ্লেষণ ও প্রয়োজন, যাতে শিক্ষিত সমাজ সহজেই সত্য ও সঠিক পথ ও পদ্ধতি অনুধাবন করতে সক্ষম হয়।

এক নজরে নবীজির সংক্ষিপ্ত জীবনী

পৃথিবী যখন ঘোর কালো অমানিশায় নিমজ্জিত, সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা যখন নীতি-নৈতিকতা বিবর্জিত। গোত্রে-গোত্রে দ্বন্দ্ব কলহ চলছিল অবিরত । বংশীয় আধিপত্য ও চারিত্রিক অবক্ষয়ে বিশ্বের আবহাওয়া যখন বিষাক্তে পরিণত। মোটকথা হাজারো অশ্লীল-বেহায়াপনা- অপকর্মকাণ্ডের অন্ধকারে পাপের সকল বিভীষিকাসহ গোটা পৃথিবী যখন মূর্খতার চাদরে আচ্ছাদিত, ঠিক তখন মানবতার পূর্ব আকাশে উদিত হয় এক নবদিগন্ত, আগমন করেন বিশ্ব শান্তি ও মুক্তির অগ্রদূত, চিরন্তন কল্যাণের মহান দিশারী, সকল গুণের সর্বোচ্চ শ্রেষ্ঠনবী, আখেরী নবী মুহাম্মদে আরাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। 

তাঁর আগমনে পথহারা মানুষ পেয়েছে সৎপথের দিশা। সমাহিত হয়েছে জুলুম ও অত্যাচারের। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সাম্য, সমতা, ন্যায়-ইনসাফ। দূরীভূত হয়েছে হিংসা-ফ্যাসাদ। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে চমৎকার সুষম ন্যায়পরায়ণ সুভ্রাতৃত্বভিত্তিক অনুপম সমাজব্যবস্থা।

সে মহামানবের জীবনী সকল মানব জাতির জন্য এক মহান আদর্শ। যিনি সকল উচ্চ গুণাবলীর সর্বোচ্চ আঁধার। যিনি মানব জীবনে সকল ক্ষেত্রে সার্বজনীন, নীতি ও আদর্শের একমাত্র উৎস। যাঁর অনুসরণে ইহ ও পরকালীন মুক্তির নিশ্চয়তা রয়েছে। বিশ্ব মানবতার জন্য মহামুক্তির রাজপথ রয়েছে যার নীতি ও দর্শনে। যাঁর সৌন্দর্য ও জ্ঞানগরিমার সীমা পরিসীমা নির্ধারণ করতে পারেনি কেউ কোনদিন। 

নবীজির জন্ম: নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পবিত্র জন্ম হয় আম্মুল ফিল (হস্তীবর্ষ) মোতাবেক ৫৭০ মতান্তরে ৫৭১ ঈসায়ী সনে, রবিউল আউয়াল মাসে সোমবার দিনে। তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। তবে অধিকাংশদের মতে ৯ই রবিউল আউয়াল  আর প্রসিদ্ধ হলো ১২ই রবিউল আউয়াল।

তাঁর জন্মের কয়েক মাস আগে পিতা আব্দুল্লাহ ইন্তেকাল করেন। নিজের দাদা আব্দুল মুত্তালিব তাঁর নাম রাখেন ‘মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল মুত্তালিব’। মমতাময়ী মা হযরত আমেনার পক্ষ থেকে তাঁর নাম রাখা হয় ‘আহমদ’।

নিজ মাতা এবং আবু লাহাবের আযাদকৃত বাঁদী সুওয়াইবাহ (রাঃ) কিছুদিন তাঁকে দুগ্ধ পান করান। এরপর কুরাইশ বংশের ঐতিহ্য অনুযায়ী হযরত হালিমা সাদিয়া (রাঃ) - কে দুগ্ধপান ও লালনের জন্য দেওয়া হয়।

চার বছর বয়সে শক্কে সদর: তথা বক্ষ বির্দীর্ণ করার ঘটনা সংঘটিত হয়। ঐতিহাসিকদের মতে, শক্কে সদরের ঘটনা চারবার সংঘটিত হয়েছে।

  1. শৈশবে হযরত হালিমা সাদিয়ার কাছে থাকা অবস্থায়।
  2. দশবছর বয়সে। -(ফাতাহুল বারী ১৩/৪৮১)
  3. নবুওয়াতপ্রাপ্তির সময়। -(মুসনাদে আবীদাউদ আততায়ালাসী ২১৫)
  4. মে’রাজের সময়। -(বুখারী শরীফ হাদীস ,৩৪৯)
  5. আরেক মতে পঞ্চমবার শক্কে সদরের কথাও উল্লেখ আছে, যা সহীহ মতানুসারে সাব্যস্ত নয়। -(সীরাতে মুস্তফা ১/৭৫)

রাসূল (সাঃ) প্রায় ছয় বছর হযরত হালিমা সাদিয়ার হাতে লালিত হন।

৬ বছর বয়সে মাতার বিয়োগ: রাসূল (সাঃ)- এর মাতা হযরত আমেনার ইন্তেকাল হয়। আবওয়া নামক স্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

৭ বছর বয়স: থেকে তিনি দাদা আব্দুল মুত্তালিবের তত্ত্বাবধানে লালিত হন।

৮ বছর বয়সে: দাদা ইন্তেকাল হয়। এর পর থেকে চাচা আবু তালেবের হাতে লালিত হন।

১২ বছর বয়সে সিরিয়া গমন: চাচার সাথে সিরিয়ার ব্যবসায়িক সফরের সঙ্গী হন। এই সফরে বুহাইরা রাহের তাঁর নবুওয়াতের ভবিষ্যদ্বাণী করেন।

মতান্তরে ১৪/১৫/২০ বছর বয়সেঃ আরবে ফুজার যুদ্ধের ঘটনা ঘটে। আপন কোন কোন চাচার পীড়াপীড়িতে রাসূল (সাঃ) অংশ নেন। কিন্তু কেতালে অংশগ্রহণ করেননি।

১৬ বছর বয়সে সামাজিক সংগঠন: মক্কাবাসীর (পাঁচ বংশীয় চুক্তি) হিলফুল ফুজুল নামের চুক্তিতে অংশগ্রহন করেন।

২৫ বছর বয়সে বিবাহ বন্ধন: রাসূল (সাঃ) হযরত খাদিজা (রাঃ) - এর ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে সিরিয়ার দ্বিতীয় সফর করেন। এই সফর থেকে প্রত্যাবর্তনের কিছুদিন পর তাঁর সততা ও নিষ্ঠা এবং ব্যবসায়িক মুনাফা অবলোকন করে হযরত খাদিজা (রাঃ) রাসূল (সাঃ) - এর কাছে বিয়ের প্রস্তাব পেশ করেন এবং বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

তৃতীয়বার সংস্কারের সময় হাজরে আসওয়াদকে নিজ হাতে স্থাপন করেন এবং এর মাধ্যমে পরস্পর যুদ্ধান্দেহী আরব গোত্রগুলোর মধ্যে ভালোবাসা ও সম্প্রতি সৃষ্টি করতে সক্ষম হন।

৩৯ বছর বয়স পর্যন্ত নিজের এমন নজির বিহীন সততা, নিষ্ঠা, কর্মতৎপরতা ও কীর্তি স্থাপন করেন, যার কারণে আপন-পর-সকলের মুখে তাঁর সততা ও নিষ্ঠার কথা উচ্চারিত হতে থাকে।

৪০ বছর বয়সে নবুয়ওত লাভ: তিনি বেশির ভাগ সময় হেরাগুহাতেই ব্যয় করেছেন। এখানেই তাঁকে নবুওয়াতের তাজ পরানো হয়।

নবুওয়াতের প্রথম বছর: তাঁর ওপর সূরায়ে আলাকের প্রথম পাঁচ আয়াত অবতীর্ণ হয়।

ঐতাহাসিকদের ঐক্যমত হলো নবুওয়াত দান করা হয়েছে রবিবার। কিন্তু মাসের ব্যাপারে ঐতিহাসিকদের ভিন্ন মত রয়েছে। ইবনে আব্দুল বার (রহ.)- এর মতে ৮ রবিউল আউয়াল তাঁকে নবুওয়াতের তাজ পরানো হয়। এই মতানুযায়ী নবুওয়াতপ্রাপ্তির সময় তাঁর বয়স ছিল ৪০ বছর। কিন্তু ইবনে ইসহাকের মত হলো তাঁকে ১৭ রমযান নবুওয়াত দানে ভূষিত করা হয়। এই মতানুযায়ী তখন তাঁর বয়স হয় চল্লিশ বছর ছয় মাস। হযরত ইবনে হাজার আসকলানী (রহ.) এই মতকেই প্রধান্য দিয়েছেন।

নবুওয়াতের দ্বিতীয় বছর: রাসূলে কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) গোপনে তাবলীগে দ্বীনের কাজ শুরু করেন। এই বছরই হযরত খাদিজা (রাঃ), হযরত ওয়ারাকা ইবনে নাওফল (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ), হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ), হযরত আফীফ কিন্দী (রাঃ), হযরত তলহা (রাঃ), হযরত সা’আদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রাঃ), হযরত খালেদ ইবনে সাঈদ (রাঃ), হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ), হযরত আম্মার (রাঃ), হযরত সুহাইব (রাঃ), হযরত আমর ইবনে আ’বাসা (রাঃ) এবং হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা (রাঃ) ঈমান আনায়ন করেন। এ সকল মহান ব্যক্তিসহ আরো কয়েকজন সাহাবীকে সাবেকীনে আওয়ালীন তথা সর্ব প্রথম সাহাবী বলা হয়।

নবুওয়াতের তৃতীয় বছর: রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- এর লালিত সন্তান হযরত যায়েদ ইবনে হারেসার পুত্র হযরত উসামার জন্ম হয়।

নবুওয়াতের চতুর্থ বছর প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচার: আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- এর প্রতি প্রকাশ্য দাওয়াত দেওয়ার নির্দেশ আসে। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রকাশ্য দাওয়াত দিতে আরম্ভ করলে আরব গোত্র বিশেষ করে কুরাইশরা প্রকাশ্য দুশমনী ও বৈরিতায় মেতে ওঠে।

নবুওয়াতের পঞ্চম বছর সাহাবাদের হাবশা হিজরত: হযরত জাফর ইবনে আবী তালেব (রাঃ) ইসলাম গ্রহন করেন। এই বছরই হাবশার প্রতি প্রথম ও দ্বিতীয় হিজরত অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম হিজরতে ১১ জন পুরুষ এবং ৫ জন নারী অংশগ্রহন করেন।

দ্বিতীয় হিজরতে ৮৬ জন পুরুষ এবং ১৬ জন নারী অংশগ্রহন করেন।

এই বছরই আবু জেহেলের হাতে হযরত সুমায়্যা (রাঃ) শহীদ হন। ইসলামের জন্য নারীদের মধ্যে তিনিই প্রথম শহীদ।

নবুওয়াতের ষষ্ঠ বছর উমরের ইসলাম গ্রহণ: হযরত হামজা (রাঃ) এবং হযরত উমর (রাঃ) ইসলাম গ্রহন করেন। তাঁদেরকে নিয়ে মসজিদে হারামে প্রকাশ্যে নামায আদায় করা হয়।

নবুওয়াতের সপ্তম বছর বয়কট (অবরুদ্ধ জীবন): মুকাত’আয়ে কুরাইশের তথা স্যোসাল বয়কটের ঘটনা ঘটে। রাসূল (সাঃ)- এর সাথে বনু হাশেম এবংব নু মুত্তালিবকে শু’আবে আবী তালেবে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। এ অবস্থাতেই রাসূল (সাঃ)-এর চাচাত ভাই আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ)- এর জন্ম হয়।

নবুওয়াতের অষ্টম বছর চন্দ্র দ্বিখন্ডীত করন: মুশরিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে শক্কে কমর তথা চন্দ্র দ্বিখন্ডিত হওয়ার অকল্পনীয় মুজিযা প্রকাশ পায়।

নবুওয়াতের দশম বছর বয়কট হতে মুক্তি: মুকাতাআ সমাপ্ত হয়। (তবকাতে ইবনে সাআদ ১/১৩৯) এ বছরই রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- এর চাচা আবু তালেব ইন্তেকাল করেন। তাঁর ইন্তেকালের প্রায় ৩ থেকে ৫ দিন পর হযরত খাদিজা (রাঃ)- এর ইন্তেকাল হয়। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই বছরকে আম্মুল হুজন তথা পেরেশানির বছর হিসেবে আখ্যায়িত করেন। (শরহুল মাওয়াহেব ১/২৯১) এ বছরই হযরত সাওদা বিনতে যুমআর সাথে রাসূল (সাঃ)- এর শাদি মোবারক অনুষ্ঠিত হয়। এই বছর হযরত আয়েশা (রাঃ) ও তাঁর আকদে নেকাহ আসেন। কিন্তু রুখসতী হয়নি। এই বছর তায়েফের হৃদয়বিদারক ঘটনাও ঘটে।

নবুওয়াতের একাদশ বছর মদিনায় ইসলাম: মদীনা থেকে আগত হাজীদের মধ্যে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- এর দাওয়াতে প্রায় ৬ জন ব্যক্তি ইসলাম গ্রহন করেন। এর মাধ্যমে আনসারদের ইসলাম দীক্ষিত হওয়ার ধারা আরম্ভ হয়।

নবুওয়াতের দ্বাদশ বছর মেরাজ: রাসূল (সাঃ)- এর ঐতিহাসিক মে’রাজ অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় উম্মতের ওপর ৫ ওয়াক্ত নামায ফরজ হয়। এ বছরই বাইআতে উকবায়ে উলা সংঘঠিত হয়। এতে ১২ জন ইসলাম গ্রহন করেন।

নবুওয়াতের ত্রয়োদশ বছর মদিনায় হিজরত: বাইআতে উকবায়ে ছানিয়া অনুষ্ঠিত হয়। যাতে ৭৩ জন পুরুষ এবং ২ জন নারী ইসলাম গ্রহন করেন। এ বছরই মুসলমানরা মদীনা হিজরতের অনুমতি পান। এ বছরই কুরাইশরা (নাউজু বিল্লাহ) রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- কে হত্যার সিন্ধান্ত নেয়। হযরত জিবরাঈল (আঃ) রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- কে কুরাইশদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে অবগত করে বলেন, আল্লাহ তা’আলা আপনাকে এখান থেকে হিজরতের অনুমতি প্রদান করেছেন। অনুমতিপ্রাপ্ত হয়ে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হযরত আবু বকর (রাঃ)- কে সঙ্গে নিয়ে মদীনায় হিজরত করেন। এখান থেকেই শুরু হয় হিজরি সন এবং মাদানী জীবন।

রাসূল (সাঃ)- এর মাদানী জিন্দেগী: হিজরতের পরের সময়কে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- এর মাদানী যিন্দেগী বলা হয়। যা ছিল অত্যন্ত গৌরবদীপ্ত সময়। এটি ছিল সত্যের বিজয়ের সূচনা।  যেখানে ইসলামী রাষ্ট্র, ভ্রাতৃত্ব ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে ওঠে।

হিজরী প্রথম বর্ষ: রাসূল (সাঃ) হযরত আবু বকর (রাঃ)- এর সাথে তিন দিন সওর গুহায় আত্ম গোপন করার পর ১ রবিউল আউয়াল মদীনার দিকে হিজরত করেন। মদিনায় পৌঁছে নবীজি ﷺ সর্বপ্রথম মসজিদে কুবা ও পরে মসজিদে নববী নির্মাণ করেন। এটি শুধু ইবাদতের স্থান ছিল না; বরং শিক্ষা, বিচার, রাষ্ট্রপরিচালনা ও সামাজিক ঐক্যের কেন্দ্র ছিল। এরপর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করে তিনি গোত্রভিত্তিক সমাজকে ঈমানভিত্তিক সমাজে রূপ গড়ে তুলেন। মদিনা সনদের মাধ্যমে মুসলিম, ইহুদি ও অন্যান্য সম্প্রদায়কে নিয়ে একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র কাঠামো প্রতিষ্ঠিত করেন। এ বছর হযরত সালমান ফারেসী (রাঃ) ইসলাম গ্রহন করেন। আযান ও ইকামতও এ বছর আরম্ভ হয়।

২য় হিজরী: এ বছর ইসলামের প্রথম এবং বড় যুদ্ধ বদর  সংঘটিত হয়। সংখ্যায় কম হলেও মুসলমানরা আল্লাহর সাহায্যে বিজয় লাভ করে। এই যুদ্ধ মুসলমানদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং প্রমাণ করে—বিজয়ের মাপকাঠি সংখ্যা নয়, ঈমান। একই বছরে রোজা ও যাকাত ফরজ হয় এবং কিবলা কাবার দিকে পরিবর্তিত হয়।

৩য় হিজরী: এ বছর উহুদ যুদ্ধ মুসলমানদের জন্য একটি কঠিন শিক্ষা নিয়ে আসে। শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে সাময়িক বিপর্যয় নেমে আসে। কিন্তু এই ঘটনা মুসলমানদের আনুগত্য, ধৈর্য ও আত্মসমালোচনার শিক্ষা দেয়।

৫ম হিজরী: খন্দক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। অল্প শক্তি নিয়েও মুসলমানরা কৌশল ও ধৈর্যের মাধ্যমে সম্মিলিত শত্রু শক্তিকে প্রতিহত করে। এ যুদ্ধ প্রমাণ করে—ইসলাম শুধু তরবারির নয়, প্রজ্ঞারও ধর্ম।

৬ষ্ঠ হিজরী: এই বছর হুদাইবিয়ার সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়। আপাতদৃষ্টিতে এটি মুসলমানদের জন্য কঠিন মনে হলেও বাস্তবে এটি ইসলামের দাওয়াতের দরজা খুলে দেয়। যুদ্ধবিহীন পরিবেশে বহু মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে।

৭ম হিজরী: খায়বার বিজয়ের মাধ্যমে মুসলমানরা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়। এ সময় নবীজি ﷺ পারস্য, রোমসহ বিভিন্ন শাসকের কাছে ইসলামের দাওয়াত পাঠান—ইসলাম যে বৈশ্বিক বার্তা, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

৮ম হিজরী৮ম হিজরীতে ঘটে ইতিহাসের এক অনন্য ঘটনা—মক্কা বিজয়।দীর্ঘ ২১ বছরের নির্যাতনের পর নবীজি ﷺ রক্তপাতহীনভাবে মক্কা বিজয় করেন। শত্রুদের ওপর পূর্ণ ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও  প্রতিশোধ নয়—তিনি ঘোষণা করেন সাধারণ ক্ষমা। শত্রুরাও তাঁর ক্ষমাশীলতায় বিমুগ্ধ হয়। এই বিজয় প্রমাণ করে—ইসলামের প্রকৃত শক্তি প্রতিশোধে নয়, ক্ষমায়।

আর কাবাঘর মূর্তিমুক্ত হয় এবং তাওহীদের আলো পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। 

৯ম হিজরী তাবুক অভিযানের মাধ্যমে মুসলমানদের দৃঢ়তা ও ত্যাগের পরীক্ষা হয়। এ বছর বহু গোত্র প্রতিনিধি দল পাঠিয়ে ইসলাম গ্রহণ করে। তাই একে বলা হয় ‘প্রতিনিধিদের বছর’।

১০ম হিজরি (৬৩২ খ্রি.) — বিদায় হজ্জ

আরাফাতের ময়দানে নবীজি ﷺ প্রদান করেন ঐতিহাসিক বিদায়ী ভাষণ। মানবাধিকার, নারী সম্মান, ভ্রাতৃত্ব ও ইনসাফের এক পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা তিনি রেখে যান উম্মতের জন্য— যা আজও সভ্যতার মানদণ্ড। 

এখানেই নাজিল হয়—

ٱلۡیَوۡمَ أَكۡمَلۡتُ لَكُمۡ دِینَكُمۡ وَأَتۡمَمۡتُ عَلَیۡكُمۡ نِعۡمَتِی وَرَضِیتُ لَكُمُ ٱلۡإِسۡلَـٰمَ دِینۚ

আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম।

নবীজির ওফাত: 

বিদায় হজ থেকে ফেরার পর হিজরী ১১ সালের সফর মাসে নবীজী ভীষণ জ্বরে আক্রান্ত হন। জ্বরের তাপমাত্রা প্রচণ্ড হওয়ার কারণে পাগড়ির ওপর থেকেও উষ্ণতা অনুভূত হচ্ছিল। অসুস্থ অবস্থাতেও তিনি এগারো দিন নামাজের ইমামতি করেন। ধীরে ধীরে অসুস্থতা তীব্র হওয়ায় তিনি হযরত আবু বকর রা. কে ইমামতি করার জন্য নির্দেশ দেন। আবু বকর রা. নবীজির জীবদ্দশায় প্রায় অনেক দিন নামাজের ইমামতি করেন। অতঃপর যখন রাসুল সা. এর আয়ুকাল সমাপ্তির সন্নিকটে পৌঁছায় তখন নিজের মধ্যে কিছুটা আঁচ করতে পেরেছেন, তাই তিনি সকল স্ত্রীর অনুমতি নিয়ে হযরত আয়েশা রা.-এর কামরায় অবস্থান করেন। সেদিন হযরত আয়েশা রা.-এর নিকট সাত কিংবা আট দিনার মওজুদ ছিল, নবী সা. মৃত্যুর একদিন পূর্বে এগুলোও দান করে দেয়ার হুকুম দেন। বলা হয় এই অসুস্থতা ছিল খাইবারের এক ইহুদি নারীর তৈরি বিষ মেশানো খাবার গ্রহণের কারণে। অবশেষে এগারোতম হিজরী সনের রবিউল আউয়াল মাসের বারোতম তারিখ সন্ধ্যায় তিনি মৃত্যবরণ করেন। এ সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। নবীজির জামাতা হযরত ফাতেমা হযরত আলী রা. তাঁকে গোসল দেন এবং কাফন পরান। হযরত আয়েশা রা.-এর কামরার যে স্থানে তিনি মৃত্যুবরণ করেন, জানাযার পর সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়।

Under Construction

Under Construction

Under Construction