দাওয়াহ পরিচিতি
ইসলামী দাওয়াহ: পরিচিতি ও প্রয়োজনীয়তা
ইসলামী দাওয়াত যুগে যুগে মুসলমানদের ওপর অর্পিত এক অত্যন্ত মহৎ ও মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব। এটি কেবল কিছু ধর্মীয় ধারণা বা তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার নাম নয়; বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ও সর্বাঙ্গীণ বার্তা, যার লক্ষ্য হলো ব্যক্তিমানুষের চরিত্র গঠন, সমাজের নৈতিক সংস্কার এবং মানবসমাজে সত্য, ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা। ইসলামী দাওয়াত মানুষের মাঝে এমন এক মানবিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়, যা দয়া, সহানুভূতি, সহনশীলতা ও পারস্পরিক সম্মানের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ইসলামের ইতিহাস মূলত দাওয়াতের ইতিহাস। মক্কার প্রতিকূল পরিবেশে রাসূল ﷺ ধৈর্য ও প্রজ্ঞার সঙ্গে দাওয়াত দিয়েছেন। মদিনায় হিজরতের পর একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলেছেন। পরবর্তীতে সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন ও আলেমদের প্রচেষ্টায় ইসলাম এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপে বিস্তৃত হয়েছে—বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নৈতিকতা ও মানবিক আচরণের মাধ্যমে। ইসলামী দাওয়াতের ভিত্তি গড়ে উঠেছে কুরআনুল কারীম ও রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর সুন্নাহর ওপর। এই দাওয়াত মানুষের জীবনের সব দিককে স্পর্শ করে—আত্মিক ও আধ্যাত্মিক জীবন, পার্থিব জীবন, সামাজিক আচরণ, নৈতিকতা এবং মানবিক দায়িত্ব—সবকিছুই এর অন্তর্ভুক্ত।
দাওয়াহ: শব্দ ও পরিভাষা
ভাষাগতভাবে ‘দাওয়াত’ শব্দের অর্থ হলো আহ্বান জানানো বা ডাকা। আর শরঈ পরিভাষায় দাওয়াত বলতে বোঝায়—মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বান করা, তাদের এমন কাজের দিকনির্দেশ দেওয়া যা দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ বয়ে আনে, এবং সেই সব পথ ও আচরণ থেকে সতর্ক করা যা আল্লাহর সন্তুষ্টি থেকে মানুষকে দূরে সরিয়ে দেয়।
দাওয়াত কী
দাওয়াত সম্পর্কে ইসলামী চিন্তাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের সংজ্ঞা অনুযায়ী, দাওয়াত হলো— মানুষকে আল্লাহর পরিচয় দেওয়া, তাঁর দীনের শিক্ষা প্রদান করা, আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদতের প্রতি উৎসাহিত করা, তাঁর বিধান ও শরিয়াহ অনুসরণের আহ্বান জানানো এবং এ পথে চললে মানুষের জন্য কী কল্যাণ রয়েছে তা স্পষ্ট করে বোঝানো। আরেক দল আলেম দাওয়াতকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে— “মানুষকে ইসলামের দিকে আহ্বান করা, তাদেরকে ইসলাম শিক্ষা দেওয়া এবং ইসলামী বিধান বাস্তব জীবনে প্রয়োগে উদ্বুদ্ধ করা।” এই অর্থে দাওয়াত মানবজাতির ইতিহাসের মতোই প্রাচীন। বলা যায়, মানব ইতিহাসের সূচনালগ্ন থেকেই দাওয়াতের অস্তিত্ব রয়েছে। হযরত আদম (আ.)-এর যুগ থেকেই এর সূচনা—তিনি নিজ সন্তান ও বংশধরদের আল্লাহর প্রতি ঈমান আনতে, তাঁর সন্তুষ্টির পথে চলতে এবং অসন্তুষ্টির কাজ থেকে বিরত থাকতে শিক্ষা দিতেন। এটিই ছিল দাওয়াতের প্রকৃত রূপ। এরপর দাওয়াতের এই ধারা অব্যাহত থাকে। হযরত নূহ (আ.) ছিলেন পৃথিবীর মানুষের প্রতি প্রেরিত প্রথম রাসূল। তিনি দিন-রাত, প্রকাশ্যে ও গোপনে—সব উপায়ে নিজের জাতিকে আল্লাহর দিকে আহ্বান জানান। তাঁর পর হযরত হূদ, সালেহ, শু‘আইব, ইবরাহিম (আ.) এবং বনী ইসরাঈলের অন্যান্য নবীগণ—প্রত্যেকেই নিজ নিজ জাতিকে একই আহ্বান জানিয়েছেন: “তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোনো উপাস্য নেই।” অবশেষে নবুয়তের এই ধারার সমাপ্তি ঘটে হযরত মুহাম্মদ ﷺ–এর মাধ্যমে। তিনি দাওয়াতের দায়িত্ব পূর্ণ নিষ্ঠা ও পরিপূর্ণতার সঙ্গে আদায় করেছেন—রিসালাত পৌঁছে দিয়েছেন, আমানত রক্ষা করেছেন, উম্মাহকে উপদেশ দিয়েছেন, অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করেছেন এবং আল্লাহর পথে সংগ্রাম করতে করতে তাঁর কাছে ফিরে গেছেন।
দাওয়াতবিদ্যার জন্ম ও বিকাশ
দাওয়াহ শব্দটির একাধিক অর্থ থাকলেও এখানে উদ্দেশ্য হলো—মানুষকে আল্লাহ তায়ালার দিকে এবং তাঁর প্রেরিত দীন ইসলাম-এর দিকে আহ্বান করা। ইসলামে দাওয়াহ একটি ব্যাপক ও সর্বব্যাপী ধারণা; এর অর্থ, পরিধি ও তাৎপর্য অত্যন্ত বিস্তৃত। আধুনিক কালে দাওয়াহ কেবল একটি সাধারণ কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ না থেকে একটি স্বতন্ত্র শাস্ত্রের রূপ গ্রহণ করেছে। এই শাস্ত্রের রয়েছে নিজস্ব পরিভাষা, সুস্পষ্ট নীতি, নির্ধারিত পদ্ধতি ও সুসংগঠিত বিষয়বস্তু। আরবি ভাষায় এই শাস্ত্রকে ‘ইলমুদ দাওয়াহ’ (علم الدعوة) বলা হয়। দাওয়াহকে একটি স্বতন্ত্র, প্রাতিষ্ঠানিক ও নিয়মতান্ত্রিক শাস্ত্র হিসেবে গড়ে তোলা—এটি তুলনামূলকভাবে আধুনিক বিকাশ। এটি এমন একটি শাস্ত্র, যার নিজস্ব নীতিমালা, পরিভাষা, কাঠামো ও গবেষণাক্ষেত্র রয়েছে, যদিও এর মূল উৎস সেই প্রাচীন দাওয়াতের মধ্যেই নিহিত। বিশিষ্ট দাওয়াত চিন্তাবিদ অধ্যাপক মুহাম্মদ আল-বায়ানূনী তাঁর “আল-মাদখাল ইলা ইলমিদ দাওয়াহ” গ্রন্থে বলেন— ইসলামী দাওয়াত শুরু থেকেই ছিল জ্ঞান ও কর্ম—দুটোর সমন্বয়। রাসূল ﷺ নিজেই মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করেছেন, তাদের সামনে কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করেছেন, যারা সাড়া দিয়েছে তাদের কিতাব ও হিকমাহ শিক্ষা দিয়েছেন এবং আত্মিক পরিশুদ্ধি দান করেছেন। এই পথে তাঁকে বহু কষ্ট ও নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু তিনি ধৈর্য ও দৃঢ়তার সঙ্গে দাওয়াত চালিয়ে গেছেন, শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাঁর দীনকে বিজয়ী করেছেন এবং তাঁর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত করেছেন— “তিনি তাঁর রাসূলকে হেদায়াত ও সত্য দীনসহ প্রেরণ করেছেন, যাতে তিনি একে সব দীনের ওপর বিজয়ী করেন—যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে।” (সূরা তাওবা: ৩৩) এরপর সাহাবায়ে কেরাম ও খোলাফায়ে রাশেদীন এই দায়িত্ব বহন করেন। তারা ছিলেন পথপ্রদর্শক ও সৎপথপ্রাপ্ত। তাদের পর তাবেঈন ও পরবর্তী প্রজন্ম একইভাবে দাওয়াতের দায়িত্ব পালন করেন। সে যুগে দাওয়াত ছিল মুসলিম জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। প্রতিটি মুসলমান দাওয়াতকে নিজের জীবন ও পরকালের সৌভাগ্যের মূল মনে করতেন। ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক সব প্রচেষ্টা মিলিয়ে সমাজ ছিল একটি দাওয়াতমুখী সমাজ। এমনকি ইসলামী রাষ্ট্রও দাওয়াতকে তার প্রধান দায়িত্ব হিসেবে দেখত। রাষ্ট্র দাওয়াতের জন্য পরিকল্পনা করত, শরিয়াহ বাস্তবায়ন করত, দাঈ পাঠাত, প্রতিনিধি গ্রহণ করত, সীমান্ত রক্ষা করত এবং প্রয়োজন হলে শক্তির মাধ্যমেও দীনকে সুরক্ষা দিত। এই কারণে সে যুগে আলাদা করে ইলমুদ দাওয়াহ নামে কোনো শাস্ত্রের প্রয়োজন পড়েনি। কারণ পুরো সমাজই ছিল দাওয়াতের কাজে নিয়োজিত।
ইলমুদ দাওয়াহর প্রয়োজনীয়তা
কিন্তু সময়ের সাথে সাথে মুসলিম সমাজে অবক্ষয় দেখা দিল। মানুষ দাওয়াতের অনেক বৈশিষ্ট্য হারাতে শুরু করল। কর্মবিমুখতা বাড়ল, দাওয়াতকারীর সংখ্যা কমে গেল। জ্ঞান ও আমলের মধ্যে বিচ্ছেদ সৃষ্টি হলো—কেউ কেবল জ্ঞানচর্চায় ব্যস্ত, আমলহীন; কেউ আবার অজ্ঞতার ওপর ভর করে কাজ করতে লাগল। এর ফল হিসেবে মুসলিম সমাজে বিপর্যয় নেমে আসে। দাওয়াত তার প্রাণশক্তি হারাতে থাকে। অবশেষে ইসলামী খেলাফতের পতনের মাধ্যমে দাওয়াতের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিতেও চরম আঘাত আসে। এই পরিস্থিতিতে কিছু সচেতন মুসলমান নতুন করে জেগে ওঠেন। তারা উপলব্ধি করেন দাওয়াতের গুরুত্ব এবং এটিকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রয়াস শুরু করেন। তখনই স্পষ্ট হয়ে ওঠে—দাওয়াতকে একটি স্বতন্ত্র শাস্ত্র হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি। এভাবে গড়ে ওঠে ইলমুদ দাওয়াহ—যা কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে, নবুয়তের আদর্শ ও খিলাফতের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দাওয়াতের নীতি, পদ্ধতি ও কৌশল নির্ধারণ করে। এই বিদ্যা মুসলমানদের তাদের আসল দায়িত্বের দিকে ফিরিয়ে আনে—যে দায়িত্বের কথা আল্লাহ বলেছেন: “তোমরাই সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মাহ, মানবজাতির কল্যাণের জন্য প্রেরিত; তোমরা সৎকাজের আদেশ দাও, অসৎকাজে নিষেধ করো এবং আল্লাহর ওপর ঈমান রাখো।” (সূরা আলে ইমরান: ১১০) পরবর্তীতে দাওয়াতকে কেন্দ্র করে বহু গ্রন্থ রচিত হয়, সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে, শিক্ষা কার্যক্রম চালু হয়। আজকের যুগে দাওয়াত একটি স্বীকৃত জ্ঞানশাখা—যার নিজস্ব পাঠ্যক্রম ও গবেষণা রয়েছে। তবে এই নবীন বিদ্যার সামনে এখনও বহু কাজ বাকি— এর বিষয়বস্তু আরও সুসংহত করা, পরিভাষা নির্ধারণ করা, ভুল প্রয়োগ সংশোধন করা—যেমনটি প্রতিটি নবীন শাস্ত্রের ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে।
দাওয়াহর পদ্ধতি ও নীতি
under construction
কুরআন ও দাওয়াহ
under construction
হাদীস ও দাওয়াহ
under construction
সীরাত ও দাওয়াহ
under construction
দায়ীদের জীবনী
under construction