আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআত

দুনিয়া ও আখিরাতে মুক্তি ও কল্যাণ নির্ভর করে সত্য দ্বীন মানা এবং আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আতের পথ অবলম্বনের উপর। ইসলামের মূল ধারার নামই আহলে সুন্নত ওয়াল জামা’আত—যারা রাসূল ﷺ-এর পর ইসলামকে প্রকৃত অর্থে ধারণ করেছেন এবং লালন ও চর্চা করেছেন। ইসলামের নামে যুগে যুগে বিভিন্ন ফিরকা সৃষ্টি হয়েছে; নতুন নতুন মত ও পথ আবিষ্কৃত হয়েছে। তবে একটি জামাআ’ত—যারা সূচনা কাল থেকে ইসলামকে প্রকৃত অর্থে সঠিকভাবে ধারণ করে রেখেছে—সেই জামাআ’তের নামই আহলে সুন্নত ওয়াল জামা’আত।

যেহেতু ইসলামের নামে মানুষ বিভিন্ন ফিরকায় বিভক্ত হয়ে পড়েছে, তাই প্রত্যেকের জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়েছে এই পরিভাষা ও পরিচয়ের প্রকৃত অর্থ স্পষ্টভাবে জানা। এটাও জানা জরুরি—কারা এই জামাআ’তের অন্তর্ভুক্ত আর কারা নয়। বিধায় এই সংক্ষিপ্ত আলোচনায় আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআ’তের কিছু বৈশিষ্ট্য ও লক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে, যাতে একজন মুসলিম সহজে বুঝতে পারে—কারা প্রকৃত আহলুস সুন্নাহ; ফলে সে তাদের পথ অনুসরণ করতে পারে, তাদের পদ্ধতি আঁকড়ে ধরতে পারে এবং তাদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

এখানে “সুন্নাহ” বলতে বোঝানো হয়েছে—রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তরীকা, ইলম, আমল, বিশ্বাস ও চরিত্র, যা তিনি আমাদের মাঝে রেখে গেছেন।

আর “জামা’আত” বলতে বোঝানো হয়েছে—রাসূলের সাহাবীগণ এবং যারা উত্তমভাবে তাদের অনুসরণ করেছেন ও তাদের পথ অবলম্বন করেছেন।

অতএব, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আত হলো সেই সব মানুষ, যারা সর্ব বিষয়ে রাসূল ﷺ-এর সুন্নতকে আঁকড়ে ধরে এবং সাহাবায়ে কেরামের পথ ও পদ্ধতি অবলম্বন করে। শুধু নামধারণ বা দাবি করলেই কেউ আহলুস সুন্নাহ হয়ে যায় না। প্রকৃত মানদণ্ড হলো—সুন্নাহ ও সাহাবাদের অনুসরণ করা এবং সেটিকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা; শুধু নাম বা পরিচিতি নয়। আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা’আতের বিশ্বাস ও মাসলাক বিষয়ে স্বতন্ত্র আলোচনা প্রয়োজন। এখানে সহজে আহলে সুন্নাহকে চেনা বা নিজেকে আহলে সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত রাখার সুবিধার্থে কয়েকটি আলামত তুলে ধরা হলো—

(১) তাদের আকীদার মূল উৎস—আল্লাহর কিতাব, রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহ এবং সাহাবা ও সালাফের ইমামগণ যা বুঝেছেন ও ব্যাখ্যা করেছেন। আকীদার ক্ষেত্রে আল্লাহ প্রদত্ত ওহীকেই একমাত্র উৎস হিসেবে গ্রহণ করা হয়। তারা মানববুদ্ধি, কাশফ, ইলহাম বা স্বপ্নকে ওহীর উপর প্রাধান্য দেয় না।

(২) তারা আকীদার জটিল ও সূক্ষ্ম বিষয়ের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে যোগ্য ও স্বীকৃত ইমামগণের শরণাপন্ন হয়। আকীদার ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে স্বীকৃত যতগুলো ধারা আছে, সবগুলোকে শ্রদ্ধার সাথে দেখে এবং মূল্যায়ন করে। স্বীকৃত কোনো ধারার ব্যাখ্যা গ্রহণ বা অনুসরণ করাকে তারা বিদআত মনে করে না।

(৩) আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রেও তারা কুরআন ও সুন্নাহ অনুসরণ করে। তাসাউফ ও আত্মশুদ্ধির ক্ষেত্রে রাসূল ﷺ-কেই আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে এবং সাহাবায়ে কেরামের পথ অবলম্বন করে। পাশাপাশি তাসাউফের স্বীকৃত ইমাম ও শায়েখদের শ্রদ্ধা করে এবং রাহবার ও সহযোগী হিসেবে গণ্য করে। গুনাহ পরিহার করে আত্মশুদ্ধির কাজ সঠিকভাবে সম্পাদনের জন্য কোনো একজন শায়েখকে নিজের শিক্ষক ও রাহবার হিসেবে গ্রহণ করাকে বিদআত বলা হয় না।

(৪) তারা আল্লাহর ইবাদত করে কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী। তারা ইবাদতের জন্য নিজেরা নতুন কোনো পদ্ধতি উদ্ভাবন করে না; সকল প্রকার বিদআত থেকে দূরে থাকে।

(৫) তারা আল্লাহর সমস্ত গুণাবলি বিশ্বাস করে—যেভাবে কুরআন ও হাদীসে এসেছে এবং যেভাবে সালাফের ইমামগণ গ্রহণ ও ব্যাখ্যা করেছেন।

(৬) তারা ভিন্নমতাবলম্বীদের শুধুমাত্র মতভেদের কারণে কাফির ঘোষণা করে না—যতক্ষণ না তারা সুস্পষ্ট কুফরি বিশ্বাসে লিপ্ত হয়।

(৭) তারা কাফিরদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখে, কিন্তু ঈমানদারদের ভালোবাসে ও সহযোগিতা করে—তাদের ঈমান ও সৎকর্মের ভিত্তিতে।

(৮) তারা সাহাবীদের ভালোবাসে, তাদের সকলকে ন্যায়পরায়ণ মনে করে এবং তাদের সম্মান রক্ষা করে; আবার অতিরঞ্জন থেকেও বিরত থাকে।

(৯) ফিকহে তারা কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা, ও সাহাবীদের মতামত অনুসরণ করে এবং ইমাম আবু হানিফা, মালিক, শাফিঈ, আহমাদসহ নির্ভরযোগ্য ইমামদের অনুসরণ করে। যারা মুজতাহিদ নয়, বরং সাধারণ মুসলিম—তাদের জন্য কোনো একজন ইমাম বা একটি মাযহাব অনুসরণ করাকে বিদআত বা শিরক মনে করা হয় না।

(১০) তারা সর্বক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করে—বাড়াবাড়ি বা ছাড়াছাড়ি কোনোটাই পছন্দ করে না। কুরআন ও সুন্নাহর অপব্যাখ্যা যেমন তারা সমর্থন করে না, তেমনি কুরআন ও সুন্নাহর নামে বাড়াবাড়ি ও শিথিলতাও সমর্থন করে না।

“আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আত” পরিভাষাটি হঠাৎ করে পরবর্তী যুগে সৃষ্টি হয়নি; বরং এর শিকড় নিহিত রয়েছে রাসূল সা. এর হাদীসে এবং সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ)-এর যুগেই। হযরত ইরবায ইবনে সারিয়া রা. থেকে বর্ণিত নবীজী স. বলেন,

فعليكم بسنتي وسنة الخلفاء الراشدين المهديين، تمسكوا بها، وعضوا عليها بالنواجذ، وإياكم ومحدثات الأمور، فإن كل محدثة بدعة وكل بدعة ضلالة.

‘তোমরা আমার সুন্নাহ ও আমার হেদায়েতের পথের পথিক খলীফাগণের সুন্নাহকে সর্বশক্তি দিয়ে ধারণ করবে। আর সকল নবউদ্ভাবিত বিষয় থেকে দূরে থাকবে। কারণ সকল নবউদ্ভাবিত বিষয় বিদআত। আর সকল বিদআত গুমরাহী।’

ইমাম আবু নুয়াইম হাদীসের নির্দেশনা সম্পর্কে বলেন-

فتلقت الهداة العقلاء وصية نبيهم صلى الله عليه وسلم بالقبول ولزموا التوطن على سنته وسنة الهداة المرشدة من الخلفاء، فلم يرغبوا عنه بل علموا أن الثبوت عليه غير ممكن إلا بتتبع ما سنه عليه السلام وسنه بعده أئمة الهدى الذين هم خلفائه في أمته فتركوا الاشتغال بهواجس النفوس وخواطر القلوب، وما يتولد من الشبهات التي تولد آراء النفوس وقضايا العقول خوفا من أن يزيغوا عن المحجة التي فارقهم عليها رسول الله صلى الله عليه وسلم الذي شبه ليلها بنهارها مع ما جاءهم عن الله تعالى من الوعيد البليغ المصرح بنفي الإيمان عما خالفه عليه السلام أوطعن على أحكامه ولم تطب نفسه بالتسليم له. انتهى (المستخرج على صحيح المسلم)

অর্থাৎ হেদায়েতের দিশারী প্রাজ্ঞজনরা তাঁদের নবীর এই অসীয়তকে শিরোধার্য করেছেন এবং তাঁর সুন্নাহ ও খলীফাগণের সুন্নাহর উপর নিজেদেরকে দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ রেখেছেন, যারা ছিলেন হেদায়েতপ্রাপ্ত ও হেদায়েতের দিশারী। তা থেকে বিমুখ হননি। বরং তারা নিশ্চিত জেনেছেন যে, আল্লাহর রাসূল যে সুন্নাহ জারি করেছেন এবং তাঁর পর হেদায়েতের ইমামগণ যে সুন্নাহ জারি করেছেন, যাঁরা ছিলেন উম্মতের মাঝে তাঁরই উত্তরসূরী, তা অন্বেষণ করা ছাড়া দ্বীনের উপর অবিচল থাকা সম্ভব নয়। সুতরাং তারা মনের খেয়ালখুশি , অন্তরের কল্পনা এবং বুদ্ধি ও প্রবৃত্তির মত ও মতবাদ থেকে জন্ম নেওয়া সংশয় ও বিভ্রান্তিতে আত্মনিয়োগে করেননি। ঐ উজ্জ্বল রাজপথ থেকে বিচ্যুত হওয়ার ভয়ে, যার উপর দাড় করিয়ে আল্লাহর রাসূল তাদের থেকে বিদায় নিয়েছেন। উপরন্তু আল্লাহ তা’আলার পক্ষ হতে এসেছে ঈমানহারা হওয়ার কঠিন হুঁশিয়ারি তাদের জন্য, যারা আল্লাহর রাসূলের বিরোধিতা করে, তাঁর বিধি-বিধানের নিন্দা করে কিংবা তাঁর প্রতি আত্মসমর্পিত হতে বিরত থাকে। (আল-মুসতাখরাজ, ১/৩৭)

এটি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আর পরিচয় ও বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে এটি বুনিয়াদী হাদীস। উক্ত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ইখতিলাফ হলে আমার সুন্নাহ ও খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহকে ধারণ করবে। তাহলে বুঝা গেল, নাজাতপ্রাপ্ত দলের একটি মানদন্ড হলো সুন্নাহ, অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাহ ও খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহ।

আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আর দ্বিতীয় রোকন ‘আলজামা’আ’。 এটিও হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে। এ সংক্রান্ত হাদীসটি সুনানে আবু দাউদ, মুসনাদে আহমদ ও সুনানে দারেমী ইত্যাদি কিতাবে আছে। সুনানে আবু দাউদ ও মুসনাদে আহমদে হাদীসটি যেভাবে আছে তা হল-

عن أبي عامر عبد الله بن لحي قال : حججنا مع معاوية بن أبي سفيان، فلما قدمنا مكة قام حين صلى صلاة الظهر، فقال : إن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال : إن أهل الكتابين افترقوا في دينهم على ثنتين وسبعين ملة، وإن هذه الأمة ستفترق على ثلاث وسبعين ملة، يعني الأهوءا، كلها في النار إلا الواحدة، وهي الجماعة ... انتهى.

আবু আমির আবদুল্লাহ বলেন, আমরা মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান রা.-এর সাথে হজ্ব করলাম। যখন আমরা মদীনায় আগমন করলাম, তখন যোহরের নামাযের পর তিনি দাঁড়ালেন এবং বললেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, পূর্বের দুই কিতাবধারী সম্প্রদায় তাদের ধর্মে বাহাত্তর মিল্লাতে বিভক্ত হয়েছিল। আর এই উম্মত বিভক্ত হবে তেহাত্তর মিল্লাতে। অর্থাৎ নিজস্ব খেয়াল-খুশির অনুসারী বিভিন্ন দল। সবগুলো দল জাহান্নামী হবে একটি ছাড়া। আর সেটি হচ্ছে ‘আলজামা’আ’।

হাদীসটির মান

এ হাদীস সম্পর্কে ইবনে তাইমিয়া রাহ. বলেছেন-

الحديث صحيح مشهور في السنن والمسانيد، كسنن أبي داود والترمذي والنسائي وغيرهم

অর্থ : হাদীসটি সহীহ। এটি সুনান ও মাসানীদের কিতাবের মশহূর হাদীস। আবু দাউদ, তিারমিযী, নাসায়ী ও অন্যান্যদের সুনানে তা আছে।-মাজমুউল ফাতাওয়া ৩/৩৪৫

জামে তিরমিযীতে হাদীসটির পাঠ এই-

تفترق أمتي على ثلاث وسبعين ملة، كلهم في النار إلا ملة واحدة، قالوا : من هي يا رسول الله؟ قال : ما أنا عليه وأصحابي.

অর্থাৎ আমার উম্মত তেহাত্তর মিল্লাতে বিভক্ত হবে। একটি ছাড়া বাকি সবগুলোই যাবে জাহান্নামে। সাহাবীরা জিজ্ঞাসা করলেন, আল্লাহর রাসূল! সেই এক দলে কারা থাকবেন? বললেন, মা –আনা আলাইহি ওয়া আসহাবী। অর্থাৎ যারা আমার ও আমার সাহাবীদের আদর্শের উপর থাকবে।

ইমাম তিরমিযী রাহ. বলেছেন-

هذا حديث حسن غريب مفسر لانعرفه مثل هذا إلا من هذا الوجه

অর্থ: এটি হাসান, গরীব ও মুফাসসার হাদীস; হাদীসটি এভাবে শুধু এই সূত্রেই আমরা পাই। (জামে তিরমিযী ২/৯২, হাদীস : ২৮৩২)

ما أنا عليه وأصحابي অর্থাৎ নাজাতপ্রাপ্ত তারা, যারা ঐ পথে আছে, যে পথে আমি ও আমার সাহাবীরা রয়েছি। এখানে ‘মা’ দ্বারা সুন্নাহকে নির্দেশ করা হয়েছে। তাহলে এই হাদীসে ‘মা-আনা আলাইহি’ শব্দে তাই বলা হয়েছে, যা আগের হাদীসে ‘আলাইকুম বিসুন্নাতী’ শব্দে বলা হয়েছিল। অর্থাৎ আমার সুন্নাহকে ধারণ কর।

তাহলে আমরা দুটি বিষয় পেলাম : ১. সুন্নাহ তথা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাহ ও খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাহ, যা সাহাবায়ে কেরামের সুন্নাহও বটে। ২. জামা’আ। (দ্র. মাসিক আল কাউছার)

এভাবে বিভিন্ন হাদীসে আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা’আহ এর প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে। সাহাবায়ে কেরামও এই পরিভাষাটি ব্যবহার করেছেন। যেমন, সূরা আল ইমরানের ১০৬ নং আয়াতের তাফসীরে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে পুরা নাম বর্ণিত হয়েছে। আয়াতটি হল-

يوم تبيض وجوه وتسود وجوه

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন-

تبيض وجوه أهل السنة والجماعة، وتسود وجوه أهل البدعة والفرقة

মূলত এই নামটি ব্যাপকতা আরম্ভ হয়, যখন ইসলামী সমাজে প্রথম দিকেই কিছু বিদআতপন্থী ও ভ্রান্ত মতাবলম্বী দলের আবির্ভাব ঘটে, তখন সত্যপন্থী ও সুন্নাহনিষ্ঠ মুসলিমদেরকে তাদের থেকে পৃথকভাবে চিহ্নিত করার প্রয়োজন দেখা দেয়। এই প্রেক্ষাপটেই “আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আত” নামটি ব্যবহৃত হতে শুরু করে—যা দ্বারা বোঝানো হতো সেইসব মানুষকে, যারা রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহ ও সাহাবাদের সম্মিলিত পথ অনুসরণ করেন এবং বিদআত থেকে দূরে থাকেন।

এই পরিভাষার ব্যবহার বহু প্রাচীন এবং এটি সালাফে সালিহীনের যুগ থেকেই প্রচলিত ছিল। একাধিক ইমামই এই পরিভাষা ব্যবহার করেছেন। বিশেষত প্রখ্যাত তাবেয়ী ইমাম হাসান বসরী (রহ.)-এর বক্তব্যে যা খুবই সুস্পষ্টরুপে ফুটে উঠেছে। যেমন,

(১) ইমাম হাসান বসরী (রহ.)-এর বক্তব্য

ইমাম হাসান বসরী (রহ.) (জন্ম: ২১ হিজরি) বলেন:

(ابتُلينا بكَثرةِ الهَوى والخُصوماتِ في اللَّهِ، والمُجادَلةِ في القُرآنِ، وقد أُميتَتِ السُّنَنُ، وأُحييَتِ البِدَعُ، وأرجو إن شاءَ اللهُ لَو لَم يَبقَ أحَدٌ في الدُّنيا إلَّا رَجُلٌ واحِدٌ مِن أهلِ السُّنَّةِ والجَماعةِ لَكانَ أكثَرَ؛ لأنَّه دينُ اللَّهِ الأعظَمُ...)( طبقات المحدثين بأصبهان والواردين عليها (2/ 349)(..

“আমরা বিপুল সংখ্যক মতভেদ, খেয়াল-খুশির অনুসরণ এবং আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে তর্ক-বিতর্কে আক্রান্ত হয়েছি। সুন্নাহগুলো বিলুপ্তপ্রায় হয়ে গেছে, আর বিদআতগুলো জীবিত হয়ে উঠেছে। তবুও আমি আশা করি—যদি পৃথিবীতে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আতের মাত্র একজন লোকও অবশিষ্ট থাকে, তবে সেও সংখ্যায় অধিক (অর্থাৎ মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ); কারণ এটিই আল্লাহর মহান দ্বীন।

(২) ইউনুস ইবন উবায়েদ (রহ.)-এর বর্ণনা

ইউনুস ইবন উবায়েদ (রহ.) বলেন:

كانوا يَجتَمِعونَ فأتاهُمُ الحَسَنُ -يعني البصريَُ- فقال لَه رَجُلٌ: يا أبا سَعيدٍ، ما تَرى في مَجلِسِنا هذا؟ قَومٌ مِن ‌أهلِ ‌السُّنَّةِ ‌والجَماعةِ لا يَطعَنونَ على أحَدٍ، نَجتَمِعُ في بَيتِ هذا يَومًا، وفي بَيتِ هذا يَومًا، فنَقرَأُ كِتابَ اللَّهِ، ونَدعو رَبَّنا، ونُصَلِّي على النَّبيِّ صلَّى اللهُ عليه وسلَّم، ونَدعو لأنفُسِنا ولعامَّةِ المُسلِمينَ؟ قال: فنَهى عَن ذلك الحَسَنُ أشَدَّ النَّهيِ)( ((البدع والنهي عنها)) لابن وضاح (ص: 42).).

“লোকেরা একত্রে বসেছিল। তখন ইমাম হাসান বসরী (রহ.)সেখানে আসলেন। এক ব্যক্তি বলল: ‘হে আবু সাঈদ! আমাদের এই বৈঠক সম্পর্কে আপনার কী মত? আমরা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আতের লোক; আমরা কারও সমালোচনা করি না। আমরা একদিন এই বাড়িতে, আরেকদিন অন্য বাড়িতে একত্রিত হই; আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করি, তাঁর কাছে দো’আ করি, নবী ﷺ-এর উপর দরুদ পাঠ করি এবং নিজেদের ও সকল মুসলিমের জন্য দো‘আ করি।”

(৩) খলিফা হিশাম ইবন আবদুল মালিক (১২৫ হি.) ঘটনা

ولَمَّا بَلَغَ الخَليفةَ الأُمَويَّ هِشامَ بنَ عَبدِ المَلِكِ بنِ مَروانَ (72-125هـ) أنَّ عَبدَ الرَّحمَنِ بنَ القاسِمِ بنِ مُحَمَّدِ بنِ أبي بَكرٍ الصِّدِّيقِ -وكانَ مِنَ التَّابِعينَ ومِن عُلَماءِ المَدينةِ توفِّيَ سَنةَ 126هـ- خَرَجَ عليه مَعَ الحارِثِ بنِ شُرَيحٍ بخُراسانَ سَنةَ 115هـ غَضِبَ وقال لإبراهيمَ بنِ هِشامٍ المَخزوميِّ أحَدِ وُلاتِه: (أيُّ رَجُلٍ عَبدُ الرَّحمَنِ بنُ القاسِمِ؟ فقال إبراهيمُ بنُ هِشامٍ: يا أميرَ المُؤمِنينَ، مِن أهلِ السُّنَّةِ والجَماعةِ)( يُنظر: ((أنساب الأشراف)) للبلاذري (8/ 423).)،

উমাইয়া খলিফা হিশাম ইবন আবদুল মালিক (রহ.)-এর কাছে যখন খবর পৌঁছাল যে, তাবেয়ী আলেম আবদুর রহমান ইবন কাসিম (রহ.)বিদ্রোহীদের সাথে যুক্ত হয়েছেন, তখন তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁর এক গভর্নরকে জিজ্ঞেস করলেন: “আবদুর রহমান ইবন কাসিম কেমন লোক?” তিনি উত্তর দিলেন: “হে আমীরুল মু’মিনীন! তিনি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আতের অন্তর্ভুক্ত।” অর্থাৎ—তিনি কোনো বিদআতী বা খারিজি নন; বরং মূলধারার সুন্নাহনিষ্ঠ মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত।

(৪) আমর ইবন কাইস (রহ.)-এর উক্তি

আমর ইবন কাইস রহ. (১৪৬হি.) বলেন:

(إذا رَأيتَ الشَّابَّ أوَّلَ ما يَنشَأُ مَعَ أهلِ السُّنَّةِ والجَماعةِ فارجُه، وإذا رَأيتَه مَعَ أهلِ البِدَعِ فايئَسْ منه؛ فإنَّ الشَّابَّ على أوَّلِ نُشوئِه))( ((الإبانة الكبرى)) لابن بطة (1/ 205)(..

“যখন তুমি কোনো যুবককে তার জীবনের শুরুতেই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আতের সাথে দেখতে পাও, তখন তার সম্পর্কে ভালো আশা রাখো। আর যদি তাকে বিদআতপন্থীদের সাথে দেখো, তবে তার ব্যাপারে আশাহত হও; কারণ মানুষ সাধারণত তার প্রাথমিক পরিবেশ ও দীক্ষার উপরই গড়ে ওঠে।”

(৫) ইমাম আবু হানিফা (রহ. (১৫০হি.) -এর বক্তব্য

ইমাম আবু হানিফা (রহ.) (৮০–১৫০ হিজরি) বিভিন্ন স্থানে “আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আত” পরিভাষা ব্যবহার করেছেন। তিনি বলেন:

(لا يوصَفُ اللهُ تَعالى بصِفاتِ المَخلوقينَ، وغَضَبُه ورِضاهُ صِفَتانِ مِن صِفاتِه بلا كَيفٍ، وهو قَولُ أهلِ السُّنَّةِ والجَماعةِ،...)( ((الفقه الأكبر)) (ص: 159)..

“আল্লাহ তা’আলাকে সৃষ্টির গুণাবলির সাথে তুলনা করা যায় না। তাঁর রাগ ও সন্তুষ্টি—এ দুটিই তাঁর গুণ, তবে কীভাবে—তা আমরা জানি না। এটাই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আতের বক্তব্য।”

(৬) তাঁর অসিয়তে শাগরিদদের উদ্দেশে বলেন:

(اعلَموا -أصحابي وإخواني- أنَّ مَذهَبَ أهلِ السُّنَّةِ والجَماعةِ على اثنَتَي عَشرةَ خَصلةً، فمَن كانَ يَستَقيمُ على هذه الخِصالِ لا يَكونُ مُبتَدِعًا ولا صاحِبَ هَوًى.....)( ((وصية الإمام الأعظم أبي حنيفة)) (ص: 25).

“হে আমার সাথীরা! জেনে রাখো—আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আতের পথ বারোটি মৌলিক বৈশিষ্ট্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। যে ব্যক্তি এই বৈশিষ্ট্যগুলোর উপর অটল থাকবে, সে বিদআতী বা প্রবৃত্তির অনুসারী হবে না…”

উপরোক্ত আলোচনাগুলো থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, “আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আত” কোনো পরবর্তী উদ্ভাবিত পরিভাষা নয়; বরং এটি ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকেই প্রচলিত একটি সুপ্রতিষ্ঠিত নাম। এর দ্বারা বোঝানো হয় সেই সব মানুষকে, যারা কুরআন-সুন্নাহ ও সাহাবাদের পথ অনুসরণ করে এবং বিদআত ও ভ্রান্ত মতবাদ থেকে নিজেদেরকে সংরক্ষণ করে।

আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা’আতের বিশ্বাস ও মাসলাক বিষয়ে স্বতন্ত্র আলোচনা প্রয়োজন। এখানে সহজে আহলে সুন্নাহকে চেনা বা নিজেকে আহলে সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত রাখার সুবিধার্থে কয়েকটি আলামত তুলে ধরা হলো—

(১) তাদের আকীদার মূল উৎস—আল্লাহর কিতাব, রাসূল ﷺ-এর সুন্নাহ এবং সাহাবা ও সালাফের ইমামগণ যা বুঝেছেন ও ব্যাখ্যা করেছেন। আকীদার ক্ষেত্রে আল্লাহ প্রদত্ত ওহীকেই একমাত্র উৎস হিসেবে গ্রহণ করা হয়। তারা মানববুদ্ধি, কাশফ, ইলহাম বা স্বপ্নকে ওহীর উপর প্রাধান্য দেয় না।

(২) তারা আকীদার জটিল ও সূক্ষ্ম বিষয়ের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে যোগ্য ও স্বীকৃত ইমামগণের শরণাপন্ন হয়। আকীদার ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে স্বীকৃত যতগুলো ধারা আছে, সবগুলোকে শ্রদ্ধার সাথে দেখে এবং মূল্যায়ন করে। স্বীকৃত কোনো ধারার ব্যাখ্যা গ্রহণ বা অনুসরণ করাকে তারা বিদআত মনে করে না।

(৩) আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রেও তারা কুরআন ও সুন্নাহ অনুসরণ করে। তাসাউফ ও আত্মশুদ্ধির ক্ষেত্রে রাসূল ﷺ-কেই আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে এবং সাহাবায়ে কেরামের পথ অবলম্বন করে। পাশাপাশি তাসাউফের স্বীকৃত ইমাম ও শায়েখদের শ্রদ্ধা করে এবং রাহবার ও সহযোগী হিসেবে গণ্য করে। গুনাহ পরিহার করে আত্মশুদ্ধির কাজ সঠিকভাবে সম্পাদনের জন্য কোনো একজন শায়েখকে নিজের শিক্ষক ও রাহবার হিসেবে গ্রহণ করাকে বিদআত বলা হয় না।

(৪) তারা আল্লাহর ইবাদত করে কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী। তারা ইবাদতের জন্য নিজেরা নতুন কোনো পদ্ধতি উদ্ভাবন করে না; সকল প্রকার বিদআত থেকে দূরে থাকে।

(৫) তারা আল্লাহর সমস্ত গুণাবলি বিশ্বাস করে—যেভাবে কুরআন ও হাদীসে এসেছে এবং যেভাবে সালাফের ইমামগণ গ্রহণ ও ব্যাখ্যা করেছেন।

(৬) তারা ভিন্নমতাবলম্বীদের শুধুমাত্র মতভেদের কারণে কাফির ঘোষণা করে না—যতক্ষণ না তারা সুস্পষ্ট কুফরি বিশ্বাসে লিপ্ত হয়।

(৭) তারা কাফিরদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখে, কিন্তু ঈমানদারদের ভালোবাসে ও সহযোগিতা করে—তাদের ঈমান ও সৎকর্মের ভিত্তিতে।

(৮) তারা সাহাবীদের ভালোবাসে, তাদের সকলকে ন্যায়পরায়ণ মনে করে এবং তাদের সম্মান রক্ষা করে; আবার অতিরঞ্জন থেকেও বিরত থাকে।

(৯) ফিকহে তারা কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা, ও সাহাবাদের মতামত অনুসরণ করে এবং ইমাম আবু হানিফা, মালিক, শাফিঈ, আহমাদসহ নির্ভরযোগ্য ইমামদের অনুসরণ করে। যারা মুজতাহিদ নয়, বরং সাধারণ মুসলিম—তাদের জন্য কোনো একজন ইমাম বা একটি মাযহাব অনুসরণ করাকে বিদআত বা শিরক মনে করা হয় না।

(১০) তারা সর্বক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন করে—বাড়াবাড়ি বা ছাড়াছাড়ি কোনোটাই পছন্দ করে না। কুরআন ও সুন্নাহর অপব্যাখ্যা যেমন তারা সমর্থন করে না, তেমনি কুরআন ও সুন্নাহর নামে বাড়াবাড়ি ও শিথিলতাও সমর্থন করে না।

আশ’আরী ও মাতুরীদী—এই দুই ধারাই মূলত আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আতের অন্তর্ভুক্ত; এগুলো নতুন কোনো ফিরকা নয়।

“আশ’আরী” শব্দটি এসেছে ইমাম আবু হাসান আল-আশ’আরী (রহ.) (মৃত্যু ৩২৪ হিজরি)-এর নাম থেকে। আকীদার ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে যারা তাঁর বক্তব্য ও পদ্ধতি গ্রহণ করেন, তাদেরকে আশ’আরী বলা হয়। আর “মাতুরীদী” শব্দটি এসেছে ইমাম আবু মনসুর আল-মাতুরীদী (রহ.) (মৃত্যু ৩৩৩ হিজরি)-এর নাম থেকে। আকীদার ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে যারা তাঁর বক্তব্য ও পদ্ধতি অনুসরণ করেন, তাদেরকে মাতুরীদী বলা হয়।

এই দুই মহান ইমামই ছিলেন হক ও হেদায়েতের ইমাম। তারা আকীদার ক্ষেত্রে নতুন কোনো বিদআত বা অভিনব মত নিয়ে আসেননি; বরং সাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে সালিহীন যে আকীদা অনুসরণ করতেন, সেটিকেই সুস্পষ্ট দলিল-প্রমাণের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন এবং পথভ্রষ্ট মতবাদগুলোর অপপ্রচার ও সংশয় দূর করেছেন। সুতরাং আশ’আরী ও মাতুরীদী মূলত আকীদার ব্যাখ্যা ও ভ্রান্ত মতবাদ খণ্ডনের দুটি স্বীকৃত ধারার নাম—নতুন কোনো ফিরকার নাম নয়।

বাস্তবে ইসলামী আকীদার গভীর বিষয়গুলোতে এই দুই ধারার আলেমরাই বিশেষজ্ঞ হিসেবে স্বীকৃত। ইসলামী উম্মাহর অধিকাংশ ফকীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও দ্বীনদার আলেমগণ এই পদ্ধতির সাথে একমত পোষণ করেছেন। তাই কারও আকীদা যদি এই দুই ধারার মূলনীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তবে সে অবশ্যই আহলুস সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত।

আশ’আরী ও মাতুরীদীদের মধ্যে মতপার্থক্য খুবই সীমিত। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা শব্দগত পার্থক্য অথবা এমন কিছু গৌণ আকীদাগত বিষয়ে, যেগুলোতে ভিন্নমত থাকার অবকাশ রয়েছে এবং যেগুলোর ব্যাপারে কুরআন-সুন্নাহর দলিল চূড়ান্ত ও দ্ব্যর্থহীন নয়। আহলুস সুন্নাহ যে সামগ্রিক আকীদা উপস্থাপন করে, তা মূলত কুরআন ও সুন্নাহ থেকেই গ্রহণ করা। তবে কিছু সূক্ষ্ম কালামি আলোচনার বিষয় রয়েছে, যেগুলো ইজতিহাদ নির্ভর—কারণ সেগুলোর দলিল হয়তো তাওয়াতুর পর্যায়ের নয়, অথবা ভাষাগতভাবে একাধিক অর্থ গ্রহণের সম্ভাবনা রাখে। এ ধরনের বিষয়ে আলেমরা একে অপরকে দোষারোপ করেননি; বরং কখনো কাউকে কাফির, বিদআতী, পথভ্রষ্ট বা ফাসিক আখ্যা দেননি।

ইমাম আশ’আরীর আবির্ভাব হয় এমন এক সময়ে, যখন মু’তাযিলা ও কিছু দার্শনিকের প্রভাব ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। তারা কুরআন-সুন্নাহর বাণীর উপর নিজেদের বুদ্ধি ও দর্শনকে প্রাধান্য দিত, অথচ তাদের এই চিন্তাধারা আকীদার বহু বিষয়ে সত্য থেকে বিচ্যুত ছিল। এই জটিল পরিস্থিতিতে ইমাম আশ’আরী এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতি গ্রহণ করেন, যার মাধ্যমে তিনি কুরআন-সুন্নাহর আকীদাকে সমর্থন করেন—একদিকে অকাট্য বর্ণনাগত দলিল, অন্যদিকে সুস্থ যুক্তিবোধ—উভয়ের সমন্বয়ে। তাঁর অনুসারী কিছু আলেম সুন্দরভাবে বলেছেন: “শরীয়ত হলো সূর্যের মতো, আর বুদ্ধি হলো চোখের মতো; দৃষ্টিশক্তি তখনই সম্পূর্ণ হয়, যখন উভয়টি একত্রে কাজ করে।”

এই পদ্ধতি ইসলামের বড় বড় আলেমদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে—হানাফি, শাফেয়ী, মালিকী মাযহাবের অধিকাংশ আলেম এবং হানাবিলা মাযহাবেরও একটি বড় অংশ এটি সমর্থন করেছেন।

একই ধরনের পরিস্থিতিতে ইমাম আবু মনসুর আল-মাতুরীদী (রহ.)-এর আবির্ভাব ঘটে। তিনিও সমসাময়িক নানা ফিতনা ও ভ্রান্ত মতবাদের খণ্ডন করেন এবং ইসলামী আকীদাকে সমুন্নত করার লক্ষ্যে তর্ক ও মুনাযারায় অংশগ্রহণ করেন। তিনি বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেন এবং আকীদার বিষয়গুলোকে সুসংগঠিতভাবে উপস্থাপন করেন।

তিনি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আতের এমন একজন গুরুত্বপূর্ণ ইমাম, যিনি আকীদার বিষয়গুলোকে কুরআন-সুন্নাহর দলিল (নকল) এবং সুস্থ যুক্তি (আকল)—উভয়ের সমন্বয়ে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও সুদৃঢ়ভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর এই অবদান ইসলামী চিন্তাধারায় গভীর প্রভাব ফেলেছে এবং পরবর্তী যুগের আলেমদের জন্য একটি সুসংহত পথনির্দেশনা প্রদান করেছে।

ইমাম মাতুরীদী (রহ.) তাঁর আকীদাগত চিন্তায় ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর কালামি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে উপকৃত হয়েছেন। তবে তিনি কেবল আবু হানিফার মতামতের ব্যাখ্যাকার ছিলেন না; বরং নিজস্ব পদ্ধতি ও চিন্তার মাধ্যমে একটি স্বতন্ত্র ধারা প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর গবেষণামূলক মনন, বিশ্লেষণী ক্ষমতা এবং যুক্তিভিত্তিক উপস্থাপনা তাঁকে তাঁর যুগের একজন মুজাদ্দিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

বংশপরিচয়ের দিক থেকেও তাঁর একটি বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। বলা হয়, তাঁর বংশধারা মহান সাহাবি আবু আইয়ুব আনসারী (রাঃ)-এর সাথে সম্পৃক্ত—যিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে মদিনায় হিজরতের পর নিজের ঘরে আতিথ্য দিয়েছিলেন। এ কারণেই অনেক আলেম, যেমন কামালুদ্দীন আল-বায়াদী (রহ.) তাঁকে “আল-মাতুরীদী আল-আনসারী” বলে উল্লেখ করেছেন।

সর্বোপরি, ইমাম আবু মনসুর আল-মাতুরীদী (রহ.) ছিলেন এমন এক মহান ইমাম, যিনি আহলুস সুন্নাহর আকীদাকে সুসংগঠিতভাবে ব্যাখ্যা, সংরক্ষণ ও শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রেখেছেন। তাঁর পদ্ধতি ও চিন্তাধারা আজও মুসলিম উম্মাহর একটি বৃহৎ অংশের জন্য পথপ্রদর্শক হিসেবে বিদ্যমান।