• Separator
  • যে কোনো বিষয়ে শরীয়ী সমাধান ও পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করুন ডিটা প্রধান কার্যালয় — জামিয়া সুফফাহ শারকিয়া, দারুল ইফতায়।
  • Separator
  • দাওয়াহ, জ্ঞান ও সেবায় সমৃদ্ধ উম্মাহ গড়তে সাথে থাকুন।
  • Separator
  • প্রতি শুক্রবার নিয়মিত ইসলাহী প্রোগ্রাম এবং প্রতি ইংরেজি মাসের দ্বিতীয় শুক্রবার দারুসুল কুরআন প্রোগ্রাম অনুষ্ঠিত হয়—স্থান: সুত্রাপুর, বগুড়া।
  • Separator
  • যে কোনো বিষয়ে শরীয়ী সমাধান ও পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করুন ডিটা প্রধান কার্যালয় — জামিয়া সুফফাহ শারকিয়া, দারুল ইফতায়।
  • Separator
  • যে কোনো বিষয়ে শরীয়ী সমাধান ও পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করুন ডিটা প্রধান কার্যালয় — জামিয়া সুফফাহ শারকিয়া, দারুল ইফতায়।
  • Separator
  • দাওয়াহ, জ্ঞান ও সেবায় সমৃদ্ধ উম্মাহ গড়তে সাথে থাকুন।
  • Separator
  • প্রতি শুক্রবার নিয়মিত ইসলাহী প্রোগ্রাম এবং প্রতি ইংরেজি মাসের দ্বিতীয় শুক্রবার দারুসুল কুরআন প্রোগ্রাম অনুষ্ঠিত হয়—স্থান: সুত্রাপুর, বগুড়া।
  • Separator
  • যে কোনো বিষয়ে শরীয়ী সমাধান ও পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করুন ডিটা প্রধান কার্যালয় — জামিয়া সুফফাহ শারকিয়া, দারুল ইফতায়।

ইসলামের পরিচয়

ইসলাম (اسلام) আরবী শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ অনুগত হওয়া, আনুগত্য করা, আত্মসমর্পণ করা, শান্তির পথে চলা ও মুসলমান হওয়া। 

শরী'আতের পরিভাষায় আল্লাহর অনুগত হওয়া, আনুগত্য করা ও তাঁর নিকট পূর্ণ আত্মসমর্পণ করা।' দ্বিধাহীন চিত্তে তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলা এবং তাঁর দেয়া বিধান অনুসারে জীবনযাপন করা। আর যিনি ইসলামের বিধান অনুসারে জীবনযাপন করেন তিনি হলেন মুসলিম বা মুসলমান।

ইসলাম আল্লাহ্ তা'আলার মনোনীত একমাত্র 'দীন'-একমাত্র পূর্ণাঙ্গ ও পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা। দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত এ ব্যবস্থার আলোকে একজন মুসলমানকে জীবনযাপন করতে হয়। ইসলামে রয়েছে সুষ্ঠু সমাজ, রাষ্ট্র ও অর্থব্যবস্থা, রয়েছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নীতিমালা। মানব চরিত্রের উৎকর্ষ সাধন, ন্যায়নীতি ও সুবিচারভিত্তিক শান্তি-শৃংখলাপূর্ণ গতিশীল সুন্দর সমাজ গঠন ও সংরক্ষণে ইসলামের কোনো বিকল্প নেই, হতেও পারে না। 

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন:

إِنَّ الدِّينَ عِندَ اللَّهِ الْإِسْلَامُ

ইসলামই আল্লাহর একমাত্র মনোনীত দীন।

অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে:

وَ مَنْ يُبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ

কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো দীন গ্রহণ করতে চাইলে তা কখনো তার থেকে কবূল করা হবে না 

হাদীস শরীফে ইসলামের একটি সংজ্ঞা ও পরিচিতি সুন্দরভাবে বিবৃত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন:

الإسلام أن تشهد أن لا إلهَ إِلَّا اللهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ وَثَقِيمَ الصَّلَاةَ وَتُؤْلِ الزَّكَاةَ وَتَسُوْمَ رَمَضَانَ وَتَحُجَّ الْبَيْتَ إِنِ اسْتَطَعْتَ إِلَيْهِ سَبِيلًا

ইসলাম হল তোমার এই সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ্ ব্যতীত কোনো ইলাহ্ নেই এবং মুহাম্মাদ (সা) আল্লাহ্র রাসূল, সালাত আদায় করা, যাকাত প্রদান করা, রমযানের রোযা পালন করা এবং যাতায়াতের সামর্থ্য থাকলে বায়তুল্লাহ্ শরীফে হজ্জ আদায় করা।

ইসলামই সকল নবী-রাসূলের অভিন্ন ধর্ম। হযরত আদম (আ) থেকে শুরু করে শেষনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) পর্যন্ত আগমনকারী সকল নবী-রাসূলই মানুষকে ইসলামের দিকেই আহ্বান করেছেন এবং এরই ভিত্তিতে নিজ নিজ উম্মতকে গড়ে তুলেছেন।

ইসলাম ধর্মের মর্ম হল আল্লাহ্ পরিপূর্ণ আনুগত্য করা। আর প্রত্যেক পয়গাম্বরই যেহেতু নিজে আল্লাহর পূর্ণ অনুগত থাকার সাথে সাথে উম্মতকেও তার অনুগত হওয়ার জন্য দাওয়াত দিয়েছেন, তাই সকল নবীর দীনই ইসলাম

ইসলামই একমাত্র পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা

হযরত মুহাম্মদ (সা) আল্লাহ তা'আলার শেষ নবী। কুরআন তাঁর প্রতি নাযিলকৃত আখেরী কিতাব। মহানবী (সা)-এর আগমনের পর পূর্ববর্তী শরী'আত ও কিতাব সবই রহিত হয়ে গেছে। এরপর আর কোনো নবী আসবেন না এবং কোন কিতাবও নাফিল হবে না। যাঁরা এ আকীদা পোষণ করবেন তাঁরা মুসলিম। আর যারা এ আকীদা পোষণ করবে না, তারা অমুসলিম কাফির।

ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। এতে কোন খুঁত নেই, নেই কোনো অপূর্ণতা। আল-কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:

اليومَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمْ إِلَّا سَلَامَ دِينًا

আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীন পূর্ণাঙ্গ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দীন মনোনীত করলাম।

কুরআন মজীদে আরো ইরশাদ হয়েছে।

وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَبَ تِبْيَانًا لَكُلِّ شَيْء

এবং আমি আপনার প্রতি এমন কিতাব নাযিল করেছি যার মধ্যে প্রতিটি বস্তুর স্পষ্ট বর্ণনা বিদ্যমান।

এতে একথা বোঝা যায় যে, মানবজীবনে যা কিছু প্রয়োজন তার সব কিছুর নীতি নির্ধারণী বিবরণ আল-কুরআনে আছে। প্রয়োজনীয় জ্ঞানানুশীলনের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পবিত্র জীবনাদর্শের ভিত্তিতে সবকিছুই নির্ধারণ করতে হবে। মুজতাহিদ ইমামগণ তাঁদের সম্পূর্ণ জীবন ব্যয় করেছেন এই কাজে। মানবজাতির জীবনযাপন পদ্ধতির পরিপূর্ণ ও সুষ্ঠু সমাধান তুলে ধরেছেন তাঁরা বিস্তৃতভাবে। এই জীবনব্যবস্থায় কোনোরূপ অপূর্ণতার কথা চিন্তা করা যায় না। মানুষের ঈমান-আকীদা থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক জীবনের মূলনীতিসমূহ ইসলামে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যা প্রকৃতপক্ষেই পরিপূর্ণ এবং অতুলনীয়। এতে নতুনভাবে কোনো কিছুর সংযোজন বা বিয়োজন করার আদৌ কোনো অবকাশ নেই।

ইসলাম আল্লাহ্ প্রদত্ত এমন এক জীবনব্যবস্থা যা ভারসাম্যপূর্ণ, স্বভাবসম্মত এবং মানবিক সামর্থ্যের উপযোগী।

কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে:

لا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا.

আল্লাহ্ কারো উপর এমন কোনো দায়িত্ব অর্পণ করেন না, যা তাঁর সাধ্যাতীত

ইসলাম শান্তিপূর্ণ, নির্ভেজাল এবং ভারসাম্যপূর্ণ জীবনাদর্শের বাস্তবায়ন ঘটাতে চায়। মানব জীবনের কোনো একটি বিষয় অথবা কোনো একটি দিকের উপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করা এবং স্বাভাবিক ভারসাম্য বিনষ্ট করাকে ইসলাম কোনোক্রমেই সমর্থন করে না। ইবাদত-বন্দেগী, ব্যবসা-বাণিজ্য, লেনদেন, আচার-আচরণ ও আমল-আখলাক তথা জীবনের কোনো স্তরে এমন কিছু করা আদৌ ইসলামসম্মত নয় যা ঈমান ও মানবতার ক্ষতি সাধন করে।

ইসলাম শান্তি ও সম্প্রীতির ধর্ম

ইসলাম শান্তি ও সম্প্রীতির ধর্ম। ইসলাম নিজেদের মত অন্যদেরকেও ভালোবাসতে উদ্বুদ্ধ করে। ইসলাম মানুষকে নিজের, স্বজনের, স্বদেশের তথ্য বিশ্ববাসীর কল্যাণের জন্য সক্রিয় ভূমিকা পালনে ও ত্যাগ স্বীকারের প্রেরণা যোগায়। আর তাতেই বিশ্ববাসীর জীবনধারায় নেমে আসে প্রশান্তি এবং বিদূরিত হয় অশান্তি, হিংসা, বিদ্বেষ এবং হানাহানি। ইসলামের শিক্ষা হল, মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ নাই। সাদা কালো সকল মানুষই আল্লাহর বান্দা। সমগ্র মানবজাতি একই পরিবারভুক্ত। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন:

الخلق عيان الله

সকল সৃষ্টি অল্লাহর পরিবার।

বস্তুত মানবজাতি একটি দেহের মত। কেননা আমরা সকলেই আদম ও হাওয়া (আ)-এর সন্তান।

আল-কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:

হে মানুষ। আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে , পরে তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সে ব্যক্তিত্ব অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে অধিক মুত্তাকী নিশ্চয়ই আল্লাহ সব কিছু জানেন, সমস্ত খবর রাখেন

মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনে প্রাণী ও প্রাকৃতিক সম্পদ আবশ্যক। তাই পৃথিবীতে শান্তি ও সমৃদ্ধির লক্ষে ইসলাম শুধু মানুষের প্রতিই সদয় ব্যবহারের নির্দেশ দেয়নি, উপরন্ত প্রাণির পরিচর্যা, প্রাকৃতিক সম্পদ ও উদ্ভিদের যথার্থ ব্যবহার সম্পর্কেও ইসলাম গুরুত্ব আরোপ করেছে।

রাসুলুল্লাহ(সা) বলেছেন:

الراحمون يرحمهم الرحمن ارحموا من في الْأَرْضِ يرحمكم من في السماء

যারা দয়া করে, দয়াময় আল্লাহ তাদের প্রতি দয়া করেন। তোমরা পৃথিবীবাসীদের প্রতি দয়া কর, তাহলে আকাশবাসী (আল্লাহ) তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।

মোটকথা সমস্ত সৃষ্টি জড়, অজড়, প্রাণী ও প্রকৃতি সকলেই ইসলামের উদারতায় উদ্ভাসিত ইসলাম শুধু বিশ্বাসভিত্তিক ধর্ম নয়। বরং তা বিশ্বাস ও কর্মের এক সুষম সমন্বয়ের বাস্তব অভিব্যক্তি।

ইসলাম নতুন কোন দীন নয়, বরং হযরত আদম আলাইহিস সালামের মাধ্যমে যখন থেকে পৃথিবীতে মানবজীবনের শুরু তখন থেকেই মানুষের জন্য জীবনব্যবস্থারূপে দীনুল ইসলামের শুরু। হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাধ্যমে দীনুল ইসলাম শুধু পূর্ণাঙ্গতা ও সার্বজনীনতা লাভ করেছে এবং পূর্ববর্তী দীন ও শরীয়াতের কার্যকরতা রহিত হয়েছে। এখন আখেরী নবীর উপর নাযিলকৃত কিতাব ও শরীয়ত এবং দীনুল ইসলামই হচ্ছে কেয়ামত পর্যন্ত সর্বযুগের সর্বজাতির নাজাত ও মুক্তির একমাত্র পথ।

সিরাত অর্থ জীবনী । তবে সীরাত বলতে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- এর জীবনীই বোঝানো হয়ে থাকে। অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- এর জীবনে যা কিছু ঘটেছে, তার সাথে সম্পৃক্ত, সরাসরি বা পরোক্ষভাবে তার সকল দিক, চারিত্রিক দিক, পারিবারিক জীবন, সামরিক জীবন, এককথায় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- এর সকল দিক সীরাতের অন্তর্ভুক্ত। সীরাতের অধ্যয়ন একটি উত্তম আমল বা সাওয়াবের কাজ, সিরাত পাঠ মুমিনের ঈমানকে মজবুত করে, সিরাত অধ্যয়ন কোরআন বোঝার জন্য সহায়ক, সিরাত অধ্যয়ন হাদীস বোঝার জন্যও সহায়ক, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- এর জীবন মুমিনদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ বা নমুনা। তাই সিরাত পাঠের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।

নবীজির সিরাত কেন পড়বো

মানুষ স্বভাবগতভাবেই অনুকরণপ্রিয়। জন্মলগ্ন থেকেই শিশু অনুকরণ করে তার পিতা মাতাকে। একটু বড় হলে অনুকরণ করে তার খেলার সাথী বা বন্ধু বান্ধবকে। আরো বড় হলে জীবন চলার পথে অনুকরণ করে পছন্দের কোন মানুষকে। এই অনুকরণ-অনুসরণ, একটি মানুষ জন্মলগ্ন থেকেই তার স্বভাব বহন করে থাকে। এখন প্রশ্ন হলো, সত্যিকারার্থে এমন মানুষ আছে কি? যিনি সকলের মানুষের জন্য অনুকরণীয়-অনুসরণীয় হতে পারেন। হ্যাঁ, আছেন।  তিনি হলেন আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। 

মহান আল্লাহ  তাআলা ইরশাদ করেন:

আর নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের উপর অধিষ্ঠিত।

হাদীস শরীফে ইরশাদ রয়েছে, হযরত আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন:

তোমাদের মাঝে কেহ (পূর্ণ) ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান ও সমস্ত মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় না হব।

সীরাত অধ্যয়নে নীতিমালা অনুসরণ

সীরাত বা নবীজীর জীবনচরিত অধ্যয়নের জন্য সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও নীতি রয়েছে। একজন রাসূল ও নবীর জীবনীকে সাধারণ নেতার মতো অধ্যয়ন করা কখনই যৌক্তিক নয়। নবীজীর সীরাত সম্পূর্ণরূপে সংরক্ষিত আছে কুরআন, হাদীস ও ইতিহাসগ্রন্থে। এ সকল উৎসে বর্ণিত সীরাত বিষয়ক ভাষ্য-গুলো নবুওয়াত ও রিসালত ভিত্তিক বোঝার ও ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করাই ছিলো সঠিক নিয়ম ও পদ্ধতি।

কিন্তু মডার্নিস্টরা এখানে ভিন্ন পথে হেঁটেছেন। তারা সীরাত অধ্যয়নে সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি অবলম্বন করেছেন। তারা বর্ণনাভিত্তিক ভাষ্যগুলোকে-কুরআনে থাকুক বা সহীহ হাদীসে-সর্বতোভাবে জাগতিক ও মানবিক যুক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেছেন। তারা সীরাত বোঝার ক্ষেত্রে দ্বন্দ্বাত্নক ও সমালোচনামূলক পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন এবং ব্যাখ্যার জন্য নতুন নতুন আইডিওলজি ও পদ্ধতি আমদানি করেছেন। যেখানে সীরাত নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন ও ভিন্ন বিশ্লেষণ করা হয়েছে । সুতরাং এ বিষয়ে যথাযথ সতর্ক থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন। পাশাপাশি তাঁদের ব্যবহৃত পদ্ধতির যথাযথ খন্ডন ও বিশ্লেষণ ও প্রয়োজন, যাতে শিক্ষিত সমাজ সহজেই সত্য ও সঠিক পথ ও পদ্ধতি অনুধাবন করতে সক্ষম হয়।

এক নজরে নবীজির সংক্ষিপ্ত জীবনী

পৃথিবী যখন ঘোর কালো অমানিশায় নিমজ্জিত, সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা যখন নীতি-নৈতিকতা বিবর্জিত। গোত্রে-গোত্রে দ্বন্দ্ব কলহ চলছিল অবিরত । বংশীয় আধিপত্য ও চারিত্রিক অবক্ষয়ে বিশ্বের আবহাওয়া যখন বিষাক্তে পরিণত। মোটকথা হাজারো অশ্লীল-বেহায়াপনা- অপকর্মকাণ্ডের অন্ধকারে পাপের সকল বিভীষিকাসহ গোটা পৃথিবী যখন মূর্খতার চাদরে আচ্ছাদিত, ঠিক তখন মানবতার পূর্ব আকাশে উদিত হয় এক নবদিগন্ত, আগমন করেন বিশ্ব শান্তি ও মুক্তির অগ্রদূত, চিরন্তন কল্যাণের মহান দিশারী, সকল গুণের সর্বোচ্চ শ্রেষ্ঠনবী, আখেরী নবী মুহাম্মদে আরাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। 

তাঁর আগমনে পথহারা মানুষ পেয়েছে সৎপথের দিশা। সমাহিত হয়েছে জুলুম ও অত্যাচারের। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সাম্য, সমতা, ন্যায়-ইনসাফ। দূরীভূত হয়েছে হিংসা-ফ্যাসাদ। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে চমৎকার সুষম ন্যায়পরায়ণ সুভ্রাতৃত্বভিত্তিক অনুপম সমাজব্যবস্থা।

সে মহামানবের জীবনী সকল মানব জাতির জন্য এক মহান আদর্শ। যিনি সকল উচ্চ গুণাবলীর সর্বোচ্চ আঁধার। যিনি মানব জীবনে সকল ক্ষেত্রে সার্বজনীন, নীতি ও আদর্শের একমাত্র উৎস। যাঁর অনুসরণে ইহ ও পরকালীন মুক্তির নিশ্চয়তা রয়েছে। বিশ্ব মানবতার জন্য মহামুক্তির রাজপথ রয়েছে যার নীতি ও দর্শনে। যাঁর সৌন্দর্য ও জ্ঞানগরিমার সীমা পরিসীমা নির্ধারণ করতে পারেনি কেউ কোনদিন। 

নবীজির জন্ম: নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পবিত্র জন্ম হয় আম্মুল ফিল (হস্তীবর্ষ) মোতাবেক ৫৭০ মতান্তরে ৫৭১ ঈসায়ী সনে, রবিউল আউয়াল মাসে সোমবার দিনে। তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। তবে অধিকাংশদের মতে ৯ই রবিউল আউয়াল  আর প্রসিদ্ধ হলো ১২ই রবিউল আউয়াল।

তাঁর জন্মের কয়েক মাস আগে পিতা আব্দুল্লাহ ইন্তেকাল করেন। নিজের দাদা আব্দুল মুত্তালিব তাঁর নাম রাখেন ‘মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল মুত্তালিব’। মমতাময়ী মা হযরত আমেনার পক্ষ থেকে তাঁর নাম রাখা হয় ‘আহমদ’।

নিজ মাতা এবং আবু লাহাবের আযাদকৃত বাঁদী সুওয়াইবাহ (রাঃ) কিছুদিন তাঁকে দুগ্ধ পান করান। এরপর কুরাইশ বংশের ঐতিহ্য অনুযায়ী হযরত হালিমা সাদিয়া (রাঃ) - কে দুগ্ধপান ও লালনের জন্য দেওয়া হয়।

চার বছর বয়সে শক্কে সদর: তথা বক্ষ বির্দীর্ণ করার ঘটনা সংঘটিত হয়। ঐতিহাসিকদের মতে, শক্কে সদরের ঘটনা চারবার সংঘটিত হয়েছে।

  1. শৈশবে হযরত হালিমা সাদিয়ার কাছে থাকা অবস্থায়।
  2. দশবছর বয়সে। -(ফাতাহুল বারী ১৩/৪৮১)
  3. নবুওয়াতপ্রাপ্তির সময়। -(মুসনাদে আবীদাউদ আততায়ালাসী ২১৫)
  4. মে’রাজের সময়। -(বুখারী শরীফ হাদীস ,৩৪৯)
  5. আরেক মতে পঞ্চমবার শক্কে সদরের কথাও উল্লেখ আছে, যা সহীহ মতানুসারে সাব্যস্ত নয়। -(সীরাতে মুস্তফা ১/৭৫)

রাসূল (সাঃ) প্রায় ছয় বছর হযরত হালিমা সাদিয়ার হাতে লালিত হন।

৬ বছর বয়সে মাতার বিয়োগ: রাসূল (সাঃ)- এর মাতা হযরত আমেনার ইন্তেকাল হয়। আবওয়া নামক স্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

৭ বছর বয়স: থেকে তিনি দাদা আব্দুল মুত্তালিবের তত্ত্বাবধানে লালিত হন।

৮ বছর বয়সে: দাদা ইন্তেকাল হয়। এর পর থেকে চাচা আবু তালেবের হাতে লালিত হন।

১২ বছর বয়সে সিরিয়া গমন: চাচার সাথে সিরিয়ার ব্যবসায়িক সফরের সঙ্গী হন। এই সফরে বুহাইরা রাহের তাঁর নবুওয়াতের ভবিষ্যদ্বাণী করেন।

মতান্তরে ১৪/১৫/২০ বছর বয়সেঃ আরবে ফুজার যুদ্ধের ঘটনা ঘটে। আপন কোন কোন চাচার পীড়াপীড়িতে রাসূল (সাঃ) অংশ নেন। কিন্তু কেতালে অংশগ্রহণ করেননি।

১৬ বছর বয়সে সামাজিক সংগঠন: মক্কাবাসীর (পাঁচ বংশীয় চুক্তি) হিলফুল ফুজুল নামের চুক্তিতে অংশগ্রহন করেন।

২৫ বছর বয়সে বিবাহ বন্ধন: রাসূল (সাঃ) হযরত খাদিজা (রাঃ) - এর ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে সিরিয়ার দ্বিতীয় সফর করেন। এই সফর থেকে প্রত্যাবর্তনের কিছুদিন পর তাঁর সততা ও নিষ্ঠা এবং ব্যবসায়িক মুনাফা অবলোকন করে হযরত খাদিজা (রাঃ) রাসূল (সাঃ) - এর কাছে বিয়ের প্রস্তাব পেশ করেন এবং বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

তৃতীয়বার সংস্কারের সময় হাজরে আসওয়াদকে নিজ হাতে স্থাপন করেন এবং এর মাধ্যমে পরস্পর যুদ্ধান্দেহী আরব গোত্রগুলোর মধ্যে ভালোবাসা ও সম্প্রতি সৃষ্টি করতে সক্ষম হন।

৩৯ বছর বয়স পর্যন্ত নিজের এমন নজির বিহীন সততা, নিষ্ঠা, কর্মতৎপরতা ও কীর্তি স্থাপন করেন, যার কারণে আপন-পর-সকলের মুখে তাঁর সততা ও নিষ্ঠার কথা উচ্চারিত হতে থাকে।

৪০ বছর বয়সে নবুয়ওত লাভ: তিনি বেশির ভাগ সময় হেরাগুহাতেই ব্যয় করেছেন। এখানেই তাঁকে নবুওয়াতের তাজ পরানো হয়।

নবুওয়াতের প্রথম বছর: তাঁর ওপর সূরায়ে আলাকের প্রথম পাঁচ আয়াত অবতীর্ণ হয়।

ঐতাহাসিকদের ঐক্যমত হলো নবুওয়াত দান করা হয়েছে রবিবার। কিন্তু মাসের ব্যাপারে ঐতিহাসিকদের ভিন্ন মত রয়েছে। ইবনে আব্দুল বার (রহ.)- এর মতে ৮ রবিউল আউয়াল তাঁকে নবুওয়াতের তাজ পরানো হয়। এই মতানুযায়ী নবুওয়াতপ্রাপ্তির সময় তাঁর বয়স ছিল ৪০ বছর। কিন্তু ইবনে ইসহাকের মত হলো তাঁকে ১৭ রমযান নবুওয়াত দানে ভূষিত করা হয়। এই মতানুযায়ী তখন তাঁর বয়স হয় চল্লিশ বছর ছয় মাস। হযরত ইবনে হাজার আসকলানী (রহ.) এই মতকেই প্রধান্য দিয়েছেন।

নবুওয়াতের দ্বিতীয় বছর: রাসূলে কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) গোপনে তাবলীগে দ্বীনের কাজ শুরু করেন। এই বছরই হযরত খাদিজা (রাঃ), হযরত ওয়ারাকা ইবনে নাওফল (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ), হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ), হযরত আফীফ কিন্দী (রাঃ), হযরত তলহা (রাঃ), হযরত সা’আদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস (রাঃ), হযরত খালেদ ইবনে সাঈদ (রাঃ), হযরত উসমান ইবনে আফফান (রাঃ), হযরত আম্মার (রাঃ), হযরত সুহাইব (রাঃ), হযরত আমর ইবনে আ’বাসা (রাঃ) এবং হযরত যায়েদ ইবনে হারেসা (রাঃ) ঈমান আনায়ন করেন। এ সকল মহান ব্যক্তিসহ আরো কয়েকজন সাহাবীকে সাবেকীনে আওয়ালীন তথা সর্ব প্রথম সাহাবী বলা হয়।

নবুওয়াতের তৃতীয় বছর: রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- এর লালিত সন্তান হযরত যায়েদ ইবনে হারেসার পুত্র হযরত উসামার জন্ম হয়।

নবুওয়াতের চতুর্থ বছর প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচার: আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- এর প্রতি প্রকাশ্য দাওয়াত দেওয়ার নির্দেশ আসে। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রকাশ্য দাওয়াত দিতে আরম্ভ করলে আরব গোত্র বিশেষ করে কুরাইশরা প্রকাশ্য দুশমনী ও বৈরিতায় মেতে ওঠে।

নবুওয়াতের পঞ্চম বছর সাহাবাদের হাবশা হিজরত: হযরত জাফর ইবনে আবী তালেব (রাঃ) ইসলাম গ্রহন করেন। এই বছরই হাবশার প্রতি প্রথম ও দ্বিতীয় হিজরত অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম হিজরতে ১১ জন পুরুষ এবং ৫ জন নারী অংশগ্রহন করেন।

দ্বিতীয় হিজরতে ৮৬ জন পুরুষ এবং ১৬ জন নারী অংশগ্রহন করেন।

এই বছরই আবু জেহেলের হাতে হযরত সুমায়্যা (রাঃ) শহীদ হন। ইসলামের জন্য নারীদের মধ্যে তিনিই প্রথম শহীদ।

নবুওয়াতের ষষ্ঠ বছর উমরের ইসলাম গ্রহণ: হযরত হামজা (রাঃ) এবং হযরত উমর (রাঃ) ইসলাম গ্রহন করেন। তাঁদেরকে নিয়ে মসজিদে হারামে প্রকাশ্যে নামায আদায় করা হয়।

নবুওয়াতের সপ্তম বছর বয়কট (অবরুদ্ধ জীবন): মুকাত’আয়ে কুরাইশের তথা স্যোসাল বয়কটের ঘটনা ঘটে। রাসূল (সাঃ)- এর সাথে বনু হাশেম এবংব নু মুত্তালিবকে শু’আবে আবী তালেবে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। এ অবস্থাতেই রাসূল (সাঃ)-এর চাচাত ভাই আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ)- এর জন্ম হয়।

নবুওয়াতের অষ্টম বছর চন্দ্র দ্বিখন্ডীত করন: মুশরিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে শক্কে কমর তথা চন্দ্র দ্বিখন্ডিত হওয়ার অকল্পনীয় মুজিযা প্রকাশ পায়।

নবুওয়াতের দশম বছর বয়কট হতে মুক্তি: মুকাতাআ সমাপ্ত হয়। (তবকাতে ইবনে সাআদ ১/১৩৯) এ বছরই রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- এর চাচা আবু তালেব ইন্তেকাল করেন। তাঁর ইন্তেকালের প্রায় ৩ থেকে ৫ দিন পর হযরত খাদিজা (রাঃ)- এর ইন্তেকাল হয়। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই বছরকে আম্মুল হুজন তথা পেরেশানির বছর হিসেবে আখ্যায়িত করেন। (শরহুল মাওয়াহেব ১/২৯১) এ বছরই হযরত সাওদা বিনতে যুমআর সাথে রাসূল (সাঃ)- এর শাদি মোবারক অনুষ্ঠিত হয়। এই বছর হযরত আয়েশা (রাঃ) ও তাঁর আকদে নেকাহ আসেন। কিন্তু রুখসতী হয়নি। এই বছর তায়েফের হৃদয়বিদারক ঘটনাও ঘটে।

নবুওয়াতের একাদশ বছর মদিনায় ইসলাম: মদীনা থেকে আগত হাজীদের মধ্যে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- এর দাওয়াতে প্রায় ৬ জন ব্যক্তি ইসলাম গ্রহন করেন। এর মাধ্যমে আনসারদের ইসলাম দীক্ষিত হওয়ার ধারা আরম্ভ হয়।

নবুওয়াতের দ্বাদশ বছর মেরাজ: রাসূল (সাঃ)- এর ঐতিহাসিক মে’রাজ অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় উম্মতের ওপর ৫ ওয়াক্ত নামায ফরজ হয়। এ বছরই বাইআতে উকবায়ে উলা সংঘঠিত হয়। এতে ১২ জন ইসলাম গ্রহন করেন।

নবুওয়াতের ত্রয়োদশ বছর মদিনায় হিজরত: বাইআতে উকবায়ে ছানিয়া অনুষ্ঠিত হয়। যাতে ৭৩ জন পুরুষ এবং ২ জন নারী ইসলাম গ্রহন করেন। এ বছরই মুসলমানরা মদীনা হিজরতের অনুমতি পান। এ বছরই কুরাইশরা (নাউজু বিল্লাহ) রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- কে হত্যার সিন্ধান্ত নেয়। হযরত জিবরাঈল (আঃ) রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- কে কুরাইশদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে অবগত করে বলেন, আল্লাহ তা’আলা আপনাকে এখান থেকে হিজরতের অনুমতি প্রদান করেছেন। অনুমতিপ্রাপ্ত হয়ে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হযরত আবু বকর (রাঃ)- কে সঙ্গে নিয়ে মদীনায় হিজরত করেন। এখান থেকেই শুরু হয় হিজরি সন এবং মাদানী জীবন।

রাসূল (সাঃ)- এর মাদানী জিন্দেগী: হিজরতের পরের সময়কে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- এর মাদানী যিন্দেগী বলা হয়। যা ছিল অত্যন্ত গৌরবদীপ্ত সময়। এটি ছিল সত্যের বিজয়ের সূচনা।  যেখানে ইসলামী রাষ্ট্র, ভ্রাতৃত্ব ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে ওঠে।

হিজরী প্রথম বর্ষ: রাসূল (সাঃ) হযরত আবু বকর (রাঃ)- এর সাথে তিন দিন সওর গুহায় আত্ম গোপন করার পর ১ রবিউল আউয়াল মদীনার দিকে হিজরত করেন। মদিনায় পৌঁছে নবীজি ﷺ সর্বপ্রথম মসজিদে কুবা ও পরে মসজিদে নববী নির্মাণ করেন। এটি শুধু ইবাদতের স্থান ছিল না; বরং শিক্ষা, বিচার, রাষ্ট্রপরিচালনা ও সামাজিক ঐক্যের কেন্দ্র ছিল। এরপর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করে তিনি গোত্রভিত্তিক সমাজকে ঈমানভিত্তিক সমাজে রূপ গড়ে তুলেন। মদিনা সনদের মাধ্যমে মুসলিম, ইহুদি ও অন্যান্য সম্প্রদায়কে নিয়ে একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র কাঠামো প্রতিষ্ঠিত করেন। এ বছর হযরত সালমান ফারেসী (রাঃ) ইসলাম গ্রহন করেন। আযান ও ইকামতও এ বছর আরম্ভ হয়।

২য় হিজরী: এ বছর ইসলামের প্রথম এবং বড় যুদ্ধ বদর  সংঘটিত হয়। সংখ্যায় কম হলেও মুসলমানরা আল্লাহর সাহায্যে বিজয় লাভ করে। এই যুদ্ধ মুসলমানদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং প্রমাণ করে—বিজয়ের মাপকাঠি সংখ্যা নয়, ঈমান। একই বছরে রোজা ও যাকাত ফরজ হয় এবং কিবলা কাবার দিকে পরিবর্তিত হয়।

৩য় হিজরী: এ বছর উহুদ যুদ্ধ মুসলমানদের জন্য একটি কঠিন শিক্ষা নিয়ে আসে। শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে সাময়িক বিপর্যয় নেমে আসে। কিন্তু এই ঘটনা মুসলমানদের আনুগত্য, ধৈর্য ও আত্মসমালোচনার শিক্ষা দেয়।

৫ম হিজরী: খন্দক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। অল্প শক্তি নিয়েও মুসলমানরা কৌশল ও ধৈর্যের মাধ্যমে সম্মিলিত শত্রু শক্তিকে প্রতিহত করে। এ যুদ্ধ প্রমাণ করে—ইসলাম শুধু তরবারির নয়, প্রজ্ঞারও ধর্ম।

৬ষ্ঠ হিজরী: এই বছর হুদাইবিয়ার সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়। আপাতদৃষ্টিতে এটি মুসলমানদের জন্য কঠিন মনে হলেও বাস্তবে এটি ইসলামের দাওয়াতের দরজা খুলে দেয়। যুদ্ধবিহীন পরিবেশে বহু মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে।

৭ম হিজরী: খায়বার বিজয়ের মাধ্যমে মুসলমানরা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়। এ সময় নবীজি ﷺ পারস্য, রোমসহ বিভিন্ন শাসকের কাছে ইসলামের দাওয়াত পাঠান—ইসলাম যে বৈশ্বিক বার্তা, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

৮ম হিজরী৮ম হিজরীতে ঘটে ইতিহাসের এক অনন্য ঘটনা—মক্কা বিজয়।দীর্ঘ ২১ বছরের নির্যাতনের পর নবীজি ﷺ রক্তপাতহীনভাবে মক্কা বিজয় করেন। শত্রুদের ওপর পূর্ণ ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও  প্রতিশোধ নয়—তিনি ঘোষণা করেন সাধারণ ক্ষমা। শত্রুরাও তাঁর ক্ষমাশীলতায় বিমুগ্ধ হয়। এই বিজয় প্রমাণ করে—ইসলামের প্রকৃত শক্তি প্রতিশোধে নয়, ক্ষমায়।

আর কাবাঘর মূর্তিমুক্ত হয় এবং তাওহীদের আলো পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। 

৯ম হিজরী তাবুক অভিযানের মাধ্যমে মুসলমানদের দৃঢ়তা ও ত্যাগের পরীক্ষা হয়। এ বছর বহু গোত্র প্রতিনিধি দল পাঠিয়ে ইসলাম গ্রহণ করে। তাই একে বলা হয় ‘প্রতিনিধিদের বছর’।

১০ম হিজরি (৬৩২ খ্রি.) — বিদায় হজ্জ

আরাফাতের ময়দানে নবীজি ﷺ প্রদান করেন ঐতিহাসিক বিদায়ী ভাষণ। মানবাধিকার, নারী সম্মান, ভ্রাতৃত্ব ও ইনসাফের এক পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা তিনি রেখে যান উম্মতের জন্য— যা আজও সভ্যতার মানদণ্ড। 

এখানেই নাজিল হয়—

ٱلۡیَوۡمَ أَكۡمَلۡتُ لَكُمۡ دِینَكُمۡ وَأَتۡمَمۡتُ عَلَیۡكُمۡ نِعۡمَتِی وَرَضِیتُ لَكُمُ ٱلۡإِسۡلَـٰمَ دِینۚ

আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম।

নবীজির ওফাত: 

বিদায় হজ থেকে ফেরার পর হিজরী ১১ সালের সফর মাসে নবীজী ভীষণ জ্বরে আক্রান্ত হন। জ্বরের তাপমাত্রা প্রচণ্ড হওয়ার কারণে পাগড়ির ওপর থেকেও উষ্ণতা অনুভূত হচ্ছিল। অসুস্থ অবস্থাতেও তিনি এগারো দিন নামাজের ইমামতি করেন। ধীরে ধীরে অসুস্থতা তীব্র হওয়ায় তিনি হযরত আবু বকর রা. কে ইমামতি করার জন্য নির্দেশ দেন। আবু বকর রা. নবীজির জীবদ্দশায় প্রায় অনেক দিন নামাজের ইমামতি করেন। অতঃপর যখন রাসুল সা. এর আয়ুকাল সমাপ্তির সন্নিকটে পৌঁছায় তখন নিজের মধ্যে কিছুটা আঁচ করতে পেরেছেন, তাই তিনি সকল স্ত্রীর অনুমতি নিয়ে হযরত আয়েশা রা.-এর কামরায় অবস্থান করেন। সেদিন হযরত আয়েশা রা.-এর নিকট সাত কিংবা আট দিনার মওজুদ ছিল, নবী সা. মৃত্যুর একদিন পূর্বে এগুলোও দান করে দেয়ার হুকুম দেন। বলা হয় এই অসুস্থতা ছিল খাইবারের এক ইহুদি নারীর তৈরি বিষ মেশানো খাবার গ্রহণের কারণে। অবশেষে এগারোতম হিজরী সনের রবিউল আউয়াল মাসের বারোতম তারিখ সন্ধ্যায় তিনি মৃত্যবরণ করেন। এ সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। নবীজির জামাতা হযরত ফাতেমা হযরত আলী রা. তাঁকে গোসল দেন এবং কাফন পরান। হযরত আয়েশা রা.-এর কামরার যে স্থানে তিনি মৃত্যুবরণ করেন, জানাযার পর সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়।

Under Construction

Under Construction

إن الحمد لله نحمده ونستعينه ونستهديه ،ونستغفره، ونعوذ بالله من شرور أنفسنا ومن سيئات أعمالنا، من يهده الله فلا مضل له، ومن يضلل فلا هادي له، وأشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك له ، وأشهد أن محمدا عبده ورسوله.

أما بعد: قال الله سبحانه وتعالى: يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا.

وقال رسول الله صلى الله عليه وسلم : تركت فيكم أمرين لن تضلوا ما تمسكتم بهما كتاب الله وسنة نبيه.

কুরআন-সুন্নাহ অনুসরণ: গুরুত্ব ও তাৎপর্য

দ্বীনের ভিত্তিমূল কুরআন-সুন্নাহ। কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণ ও বাস্তবায়নের দাওয়াত ইসলামের মৌলিক দাবি। কুরআন বিভিন্নভাবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছে। 'আতিউল্লাহ' ও 'আতিউর-রসূল' এর ঘোষণা হয়েছে বারংবার। সহজ, সরল, জটিল ও কলহপূর্ণ এক কথায় সার্বিক বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহ'র শরণাপন্ন হওয়ার তাকিদ দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:

فإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ

“যদি তোমরা কোন বিষয়ে বিবাদে লিপ্ত হয়ে পড়, তাহলে আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি প্রত্যাবর্তন কর। যদি তোমরা আল্লাহ ও কেয়ামত দিবসের উপর বিশ্বাসী হয়ে থাক।”

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জোর তাকিদ দিয়েছেন কুরআন-সুন্নাহকে সর্বাবস্থায় আঁকড়ে ধরতে। উম্মাতের সফলতা ও কামিয়াবীর মানদণ্ড স্থির করেছেন কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণ। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে:

تركت فيكم أمرين لن تضلوا ما تمسكتم بهما كتاب الله وسنة نبيه.

“আমি তোমাদের মাঝে দু'টি বস্তু রেখে গেলাম, তোমরা পথভ্রষ্ট হবেনা যতদিন তা আঁকড়ে ধরে থাকবে; আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূলের সুন্নাহ।”

মোটকথা, কুরআন সুন্নাহর অনুসরণের অপরিহার্যতা একটি স্বীকৃত ও স্বতঃসিদ্ধ বিষয়। একজন মুসলমানের অপরিহার্য কর্তব্য হলো নিরঙ্কুশভাবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করাা। কুরআন-সুন্নাহ নিঃসৃত বিধান অনুসরণ ও অনুকরণ করা। কুরআন-সুন্নাহর সিদ্ধান্তকেই চূড়ান্ত জ্ঞান করা। কুরআন-সুন্নাহকে ত্যাগ করে বা কুরআন-সুন্নাহলব্ধ বিধান থেকে সরে গিয়ে নাজাতের প্রশ্নই আসে না।

কুরআন-সুন্নাহয় বিধানের ধরন

কুরআন-সুন্নাহ অধ্যয়ন করলেই প্রতিভাত হবে যে, বিধান সম্বলিত আয়াত ও হাদীস দুই ধরনের:

এক. কিছু আয়াত ও হাদীস এতই স্পষ্ট ও সহজবোধ্য যে, সাধারণ শিক্ষিত মানুষও তা থেকে বিধান আহরণ করতে সক্ষম। যেমন: কুরআনে এরশাদ হয়েছে:

حُرِّمَتْ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنْزِيرِ

“তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত জীব, রক্ত, শুকরের মাংস।”

যে কোনো ব্যক্তি আয়াতটির অর্থ বুঝলেই অনায়াসেই বিধান বুঝতে সক্ষম হবে। কারণ, আয়াতটিতে কোনো সংক্ষিপ্ততা ও অস্পষ্টতা নেই। মর্মও সহজ-সরল। এ প্রকার আহকামের ক্ষেত্রে কোনো ইমামের ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। আমল সরাসরি কুরআন-সুন্নাহ অনুসরণের মাধ্যমে হবে। এ সম্পর্কে সুবিখ্যাত হানাফী আলিম আল্লামা আবদুল গণী নাবলূসী রহ. (১১৪৪ হি.) বলেন:

فالأمر المتفق عليه ، المعلوم من الدين بالضرورة لا يحتاج إلى التقيلد فيه لأحد الأربعة، كفرضية الصلاة والصوم والزكاة والحج ونحوها وحرمة الزنا واللواطة وشرب الخمر والقتل والسرقة والغصب وما أشبه ذلك. والأمر المختلف فيه هو الذي يحتاج إلى التقليد فيه.

“এটি একটি স্বীকৃত ও স্বতঃসিদ্ধ বিষয় যে, 'জরুরিয়াতে দ্বীন' (দ্বীনের সর্বজন বিধিত বিধান) জাতীয় আহকামের ক্ষেত্রে ইমাম চতুষ্টয়ের কোনো একজনের তাকলীদ করার কোনো প্রয়োজন নেই। যেমন: নামায, রোযা, যাকাত ও হজ্জ ইত্যাদির ফরজ হওয়া। যিনা, সমকামিতা, মদপান, হত্যা, চুরি-ডাকাতি হারাম হওয়া— এ জাতীয় অন্য মাসায়েল ও আহকাম। ইমামদের মতভিন্নতাপূর্ণ মাসায়েলে ক্ষেত্রেই শুধু তাকলীদের প্রয়োজন হয়। (খুলাসাতুত-তাহকীক ফী হুকমিত-তাকলীদ ওয়াত-তালফীক, পৃ ৪, মাকতাবাতুল ইয়াশীক, ইসতাম্বুল।)

দুই. পক্ষান্তরে কিছু আয়াত ও হাদীস আছে যা অস্পষ্ট, সংক্ষিপ্ত, পরস্পর বিরোধী বা সংঘাতপূর্ণ। এ থেকে অনায়াসে বিধি-বিধান আহরণ করা সম্ভব হয় না। ইজতিহাদের প্রয়োজন হয় । এ শ্রেণীর আয়াত বা হাদীস থেকে আহকাম উদ্ভাবন করতে শুধু অর্থ জানাই যথেষ্ট নয়, বরং নিয়মতান্ত্রিকভাবে ইজতিহাদের বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রম করতে হবে। যা একজন মুজতাহিদ ইমামের পক্ষেই সম্ভব।

বোঝার সুবিধার্থে নিয়ে কিছু জটিলতার ধরন উল্লেখ করা হলো:

ক. আয়াত বা হাদীস স্ববিরোধী ও সংঘাতপূর্ণ যার নিষ্পত্তি ব্যতীত বিধান স্থির করা অসম্ভব। যেমন: নামায সংক্রান্ত এক আয়াতে উল্লেখ হয়েছে:

فَاقْرَءُوا مَا تَيَسَّرَ مِنَ الْقُرْآنِ

এ আয়াতের দাবি হলো, প্রত্যেকের উপর নামাযে কুরআন পড়া আবশ্যক। কিন্তু নামায সংক্রান্ত অন্য আয়াতে এসেছে:

وَإِذَا قُرِئَ الْقُرْآنُ فَاسْتَمِعُوا لَهُ وَأَنْصِتُوا

“যখন কুরআন পড়া হয় তখন তা মনোযোগ দিয়ে শোন এবং চুপ থাক।”

প্রথম আয়াতের দাবি কুরআন পাঠ করার, আর দ্বিতীয় আয়াতের দাবি শ্রবণ করার। বাহ্যত দু’ আয়াতে স্ববিরোধী বিধান উল্লেখ হয়েছে। সাধারণজনের পক্ষে এর নিষ্পত্তি করে উভয় আয়াতের উপর আমল করা অসম্ভব। কিন্তু মুজতাহিদগণ হাদীসের আলোকে সমন্বয় সাধন করে আমাদের আমলের রাস্তা সহজ করে দিয়েছেন। প্রথম আয়াত 'ইমাম' ও একাকি নামায আদায়কারীর জন্য, আর দ্বিতীয় আয়াত 'মুকতাদীর' জন্য প্রযোজ্য।

খ. আয়াতে বা হাদীসে এমন শব্দ ব্যবহার হয়েছে যা একাধিক অর্থবোধক। নিছক ভাষাগত জ্ঞান দ্বারা কোনো একটিকে নির্দিষ্ট করা সম্ভব নয়। বরং এখানেও ইজতিহাদের প্রয়োজন হয়। যেমন: একটি প্রসিদ্ধ আয়াত:

وَالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنْفُسِهِنَّ ثَلَاثَةَ قُرُوء

এ আয়াতে قُرُوءٍ শব্দ قرء এর বহুবচন। শব্দটি দু'টি অর্থের সম্ভাবনা রাখে। ঋতুস্রাব ও ঋতুস্রাব পরবর্তী পবিত্রতা। উভয় অর্থ অনুযায়ী বিধানের মাঝে বেশ পার্থক্য রয়েছে। সাধারণের পক্ষে সমাধান করা অসম্ভব। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. দলীলের আলোকে প্রথম অর্থ গ্রহণ করেছেন। এবং এটাকেই অধিক সামঞ্জস্যশীল বলেছেন। এটাই হানাফী মাযহাবে গৃহীত।

অনুরুপ হাদীসের ভাবার্থেও একাধিক সম্ভাবনা থাকে, যা নিরসন না করা পর্যন্ত বিধান আহরণ করা সম্ভব নয়। এর অনেক দৃষ্টান্ত নবীযুগে ছিলো। একটি প্রসিদ্ধ হাদীস যা সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খন্দক যুদ্ধের পর বনু কুরাইযার সাথে যুদ্ধের নির্দেশ পান। স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুদ্ধের জন্য বের হন এবং বেলাল রা. কে ঘোষণা দিতে বলেন:

من كان سامعا مطيعا، فلا يصلين العصر إلا في بني قريظة

“যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাধ্য ও অনুগত সে যেন বনু কুরাইযায় গিয়ে আছরের নামায পড়ে।” (কিতাবুল মাগাযী, হাদীস নং-৪১১৯)

সাহাবা কেরামের রা. অনেকে সময়মত পৌঁছে গেলেন। কিছু সাহাবা রাস্তায় ছিলেন। এদিকে আছরের ওয়াক্ত শেষ হয়ে যাচ্ছিল। তাঁদের মাঝে মতভিন্নতা হলো যে আছরের নামায কোথায় পড়া যায়। একদল বললেন, আমরা ওয়াক্তমত নামায পড়ে গন্তব্যে পৌঁছাবো। রাসূলুল্লাহ্ এর উদ্দেশ্য দ্রুত পৌঁছানো, নামায কাযা করা নয়। অন্যদল বললেন, আমরা নামায বনু কুরাইযাতেই গিয়ে পড়বো যেভাবে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন। বর্ণনাকারী বলেন:

فصلت طائفة إيمانا واحتسابا وتركت طائفة إيمانا واحتسابا

যারা পথিমধ্যে নামায পড়েছেন তারাও রাসূলের প্রতি ঈমানের কারণে, সাওয়াবের নিয়তে নামায পড়েছেন। যারা কাযা করেছেন তারাও রাসূলের প্রতি ঈমানের কারণে, সাওয়াবের নিয়তে কাযা করেছেন।

পরিশেষে পূর্ণ ঘটনা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে উপস্থাপন করা হলে তিনি কাউকেই ভৎর্সনা করেননি। এখানে একটি সম্ভাবনাপূর্ণ হাদীসের মর্ম স্থির করতে মতবিরোধ হয়েছে।

গ. হাদীস থেকে বিধান গ্রহণের পূর্বে নিশ্চিত হতে হবে যে, হাদীসটি প্রমাণযোগ্য কি না? আর বলা বাহুল্য যে, হাদীস সহীহ, জয়ীফ নির্ণয় করা ইজতিহাদী বিষয়। যাতে মতভিন্নতা হওয়া স্বাভাবিকই নয়। বরং বাস্তবে হয়েছেও।

এ বিষয়গুলো অনুধাবন করলে প্রতিভাত হয় যে, এ ধরণের আয়াত ও হাদীস থেকে বিধান আহরণ করা একজন সাধারণ মানুষতো দূরের কথা একজন সাধারণ আলেমের পক্ষেও সম্ভব নয়। আল্লাহ তাআলার রহমতে মুজতাহিদ ইমামগণ অক্লান্ত পরিশ্রম করে সুনির্দিষ্ট উসূল ও ধারার ভিত্তিতে বিধি-বিধান আহরণ করে, মানুষের কছে পেশ করেছেন। যা ফিকহের কিতাবে সংকলিত রয়েছে।

কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণ: স্তর ও পদ্ধতিঃ

বিধান সম্বলিত কুরআন-সুন্নাহ যেমন দু’ধরণের, অনুরূপ কুরআন-সুন্নাহ থেকে বিধি-বিধান আহরণ করার যোগ্যতার দিক থেকেও মানুষ দু’শ্রেণীর।

এক. যারা কুরআন-সুন্নাহর স্পষ্ট ও অস্পষ্ট উভয় প্রকার দলীল থেকে বিধি-বিধান উদ্ভাবন করতে সক্ষম। সুনির্দিষ্ট উসূল ও যাবেতা অনুযায়ী ইজতিহাদ করার যোগ্যতা রাখেন। এ শ্রেণীর মহান ব্যক্তিবর্গকে শরীয়তের পরিভাষায় 'মুজতাহিদ' বলা হয়। মুজতাহিদগণ সঠিকভাবে মাসআলা আহরণ করতে পারলে দুই সাওয়াবের অধিকারী হন। অন্যথায় এক সাওয়াব লাভ করেন, যা সুস্পষ্টভাবে বুখারী-মুসলিমের হাদীসে এসেছে।

স্মরণ রাখতে হবে যে, তাঁরা অস্পষ্ট হুকুমের ব্যাখ্যাদানকারী ও বিরোধপূর্ণ হুকুমের মাঝে সমন্বয়কারী মাত্র। যেভাবে উকীল ও বিচারকগণ সংবিধানের ব্যাখ্যা দান করলে আইন প্রণেতা সাব্যস্ত হন না, অনুরূপ মুজতাহিদ ইমামগণকেও ইজতিহাদের কারণে শরীয়ত প্রণেতা সাব্যস্ত করা যাবে না। বরং তাঁরা ব্যাখ্যাদানকারী ও সমন্বয়কারী মাত্র।

দুই. যারা প্রথম শ্রেণীর মত ইজতিহাদের যোগ্যতা রাখে না। এ শ্রেণীর মানুষের কর্তব্য হলো মুজতাহিদ ইমামগণের ব্যাখ্যা ও সমাধানের আলোকে কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণ করা।

উপরোল্লিখিত জ্ঞানের স্তর লক্ষ করে এবং কোন প্রকার লোক কোন পদ্ধতিতে কুরআন-সুন্নাহ'র অনুসরণ করবে এর নির্দেশনা দিয়ে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন-

يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنْكُمْ

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর, আরো আনুগত্য কর তোমাদের মধ্যে যারা 'উলুল আমর' তাদের।”

'উলুল আমর' বলতে মুজতাহিদ ইমামগণকে বুঝানো হয়েছে। (দ্রষ্টব্য. তাফসীরে ইবনে কাছীর ও তাফসীরে কাবীর (উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা।))

তাহলে আয়াতের মর্ম দাঁড়াবে, মুসলমানরা যেন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এবং মুজতাহিদ ইমামগণের অনুসরণ করে। এ ব্যাখ্যা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, এখানে জ্ঞানের দ্বিতীয় স্তরের লোকদেরকে প্রথম স্তর তথা মুজতাহিদগণের অনুসরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যার সরল ব্যাখ্যা হচ্ছে, কঠিন ও অস্পষ্ট বিধানসমূহে তাঁদের সমাধানের আলোকে কুরআন-সুন্নাহ'র অনুসরণ করা। আয়াতের পরবর্তী অংশে ইরশাদ হয়েছে-

فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ

“যদি কোন বিষয়ে পরস্পর বৈপরিত্ব পরিলক্ষিত হয়, তাহলে কুরআন-সুন্নাহ থেকে সমাধান কর। যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালকে বিশ্বাস কর।”

আয়াতের এ অংশে কেবল মুজতাহিদগণকেই সম্বোধন করা হয়েছে। সাধারণ মুসলমানদের নয়। অর্থাৎ এর সম্পর্ক জ্ঞানের প্রথম স্তরের ব্যক্তিবর্গের সাথে। দ্বিতীয় স্তরের লোকদের সাথে নয়। যেমনটি ইমাম আবু বকর জাসসাস রহ. 'আহকামুল কুরআন' গ্রন্থে এবং প্রসিদ্ধ আহলে হাদীস আলেম নবাব সিদ্দীক হাসান খান সাহেব রহ. তাফসীরে ফাতহুল বয়ান এ সুস্পষ্টভাবে বলেছেন। (আহকামুল কুরআন, তাফসীরে ফাতহুল বয়ান)

সুতরাং আয়াতের এ অংশ দ্বারা একথা প্রমাণ করার কোনই অবকাশ নেই যে, যাদের মধ্যে ইজতিহাদের যোগ্যতা নেই তারাও অস্পষ্ট ও বিরোধপূর্ণ বিষয়ে সরাসরি কুরআন-সুন্নাহর সাহায্যে নিজেরাই সমাধান করবে। বরং এ সমস্ত লোকদেরকে আয়াতের প্রথমাংশে সম্বোধন করে বলা হয়েছে— এমন বিষয়ে তাদের কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণের পদ্ধতি হল, মুজতাহিদ ইমামগণ যে ব্যাখ্যা ও সমাধান প্রদান করবেন সে অনুযায়ী আমল করা। পক্ষান্তরে আয়াতের শেষাংশে মুজতাহিদগণকে সম্বোধন করে বলা হয়েছে, কোনো বিষয়ে যদি বিরোধ দেখা দেয় তাহলে এর সমাধনের লক্ষ্যে যেন তারা কুরআন-সুন্নাহর দ্বারস্থ হয়। এরপর নিজেদের ইজতিহাদী যোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে সমাধান খুঁজে বের করবে। অতএব প্রমাণিত হলো, এ আয়াতের শেষাংশে জ্ঞানের প্রথম স্তর তথা মুজতাহিদগণকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে ইজতিহাদ করতে। আর প্রথমাংশে জ্ঞানের দ্বিতীয় স্তর তথা ইজতিহাদ করতে অক্ষম ব্যক্তিদেরকে অনুসরণ ও তাকলীদ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

ইজতিহাদের যোগ্যতা না থকলে তাকলীদ আবশ্যক

পূর্বের আলোচনা থেকে বিষয়টি কিছুটা প্রতিভাত হয়েছে যে, যারা জানে না তারা জ্ঞানী ব্যক্তি থেকে জেনে নেবে এবং তা মেনে নিবে এটিই নিয়ম। তাই আল্লাহ তাআলা নির্দেশ করে বলেন:

فاسألوا أهل الذكر إن كنتم لا تعلمون

“অতএব যদি তোমরা না জান, তবে জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞাসা কর।”

এ আয়াতে আল্লাহ তাআলা যারা জানে না তাদেরকে 'আহলে ইলম' থেকে জেনে নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সালাফীদের শ্রদ্ধেয় আলেম আল্লামা আবু বকর জাযায়েরী রহ. এ আয়াতের ব্যখ্যায় বলেন::

وفي الآية دليل على وجوب تقليد العامة العلماء إذ هم أهل الذكر ووجوب العمل بما يفتونهم به ويعلمونهم به. (أيسر التفاسير)

একই মর্ম হাদীসেও ইরশাদ হয়েছে:

إِنَّمَا شِفَاءُ الْعِيِّ السُّوَالُ.

“যে জানে না, তার জন্য উচিত জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞাসা করা।”

সাহাবা তাবেঈগণের কর্মধারাও এমনি ছিল। যারা মুজতাহিদ তারা নিজ ইজতিহাদের মাধ্যমে কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণ করতেন। বাকিরা তাদের প্রদত্ত ব্যাখ্যার সাহায্যে কুরআন-সুন্নাহ'র অনুসরণ করত। সাধারণজন প্রশ্ন করত আর মুজতাহিদগণ উত্তর দিতেন। এ বিষয়টি নিয়ে সাহাবা ও তাবেঈদের মাঝে কোনো দ্বিমত নেই। সকলেই একমত যে, সাধারণজনদের জন্য তাকলীদ আবশ্যক। ইমাম গাযালী রহ. (৫০৫হি.) বলেন:

العامي يجب عليه الاستفتاء واتباع العلماء...بمسلكين: أحدهما: إجماع الصحابة، فإنهم كانوا يفتون العوام، ولا يأمرونهم بنيل درجة الاجتهاد، وذلك معلوم على الضرورة والتواتر من علمائهم وعوامهم... (المستصفى من علم الأصول ২/৩৮৯)

‘সাধারণদেন জন্য ওয়াজিব আলেমদেরকে ফতোয়া জিজ্ঞাসা করা এবং তাদের অনুসরণ করা। বিষয়টি দু’ভাবে প্রমাণিত; তন্মধ্যে একটি হলো, সাহাবীদের ইজমা।....’

ইমাম সাইফুদ্দীন আমেদী রহ. (৬৩১হি.) বলেন:

الْعَامِّيُّ وَمَنْ لَيْسَ لَهُ أَهْلِيَّةُ الِاجْتِهَادِ، وَإِنْ كَانَ مُحَصِّلًا لِبَعْضِ الْعُلُومِ الْمُعْتَبَرَةِ فِي الِاجْتِهَادِ يَلْزَمُهُ اتِّبَاعُ قَوْلِ الْمُجْتَهِدِينَ وَالْأَخْذُ بِفَتْوَاهُ عِنْدَ الْمُحَقِّقِينَ مِنَ الْأُصُولِيِّينَ...

وَيَدُلُّ عَلَيْهِ النَّصُّ وَالْإِجْمَاعُ وَالْمَعْقُولُ... وَأَمَّا الْإِجْمَاعُ: فَهُوَ أَنَّهُ لَمْ تَزَلِ الْعَامَّةُ فِي زَمَنِ الصَّحَابَةِ وَالتَّابِعِينَ قَبْلَ حُدُوثِ الْمُخَالِفِينَ يَسْتَفْتُونَ الْمُجْتَهِدِينَ وَيَتْبَعُونَهُمْ فِي الْأَحْكَامِ الشَّرْعِيَّةِ، وَالْعُلَمَاءُ مِنْهُمْ يُبَادِرُونَ إِلَى إِجَابَةِ سُؤَالِهِمْ مِنْ غَيْرِ إِشَارَةٍ إِلَى ذِكْرِ الدَّلِيلِ، وَلَا يَنْهَوْنَهُمْ عَنْ ذَلِكَ مِنْ غَيْرِ نَكِيرٍ، فَكَانَ إِجْمَاعًا عَلَى جَوَازِ اتِّبَاعِ الْعَامِّيِّ لِلْمُجْتَهِدِ مُطْلَقًا. (الإحكام في أصول الأحكام ৪/৪৫১)

“...আর ইজমার বিবরণ হলো: ( ভিন্নমত পোষণকারীদের আত্মপ্রকাশের পূর্ব পর্যন্ত) সাহাবা ও তাবেঈ যুগে সাধারণ মানুষ মুজতাহিদগণ থেকে ফতোয়া গ্রহণ করত এবং শরয়ী আহকামের ক্ষেত্রে তাঁদের অনুসরণ করত। মুজতাহিদ ফকীহগণ তাদেরকে দলীল উল্লেখ করা ছাড়াই ফতোয়া প্রদান করতেন। কেউ তাদেরকে এভাবে ফতোয়া প্রদান করা থেকে বারণও করত না, আপত্তিও তুলত না। অতএব এ ব্যাপারে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হলো যে, সাধারণ মানুষ সর্বাবস্থায় (দলীল উল্লেখপূর্বক কিংবা তা ব্যতীতই) মুজতাহিদের অনুসরণ করবে। (আল-ইহকাম লিল-আমেদী ৩/১৭১)

যেহেতু দ্বিতীয় স্তরের আহকামের ক্ষেত্রে সাধারণের জন্য কুরআন-সুন্নাহ অনুসরণের একমাত্র পথ হলো, মুজতাহিদ ইমামগণের ব্যাখ্যার সাহায্য গ্রহণ করা, তাই যুগে যুগে ইমামগণ সাধারণ মানুষের উপর মুজতাহিদ ইমামের অনুসরণ অপরিহার্য বলেছেন। এ প্রকার অনুসরণকেই তাকলীদ বলা হয়। আল্লামা ইবনে আবদুল বার রহ. (৪৬৩ হি.) সাধারণের জন্য তাকলীদ আবশ্যকতা একটি স্বতঃসিদ্ধ বিধান বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি ইজতিহাদের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তাকলীদ করা নিন্দিত হওয়ার প্রমাণাদি আলোচনা করে বলেন:

وهذا كله لغير العامة، فإن العامة لابد لها من تقليد علمائها عند النازلة تنزل بها، لأنها لاتتبين موقع الحجة، ولاتصل لعدم الفهم إلى علم ذلك ، لأن العلم له ،درجات لاسبيل منها إلى أعلاها إلا بنيل أسفلها، وهذا هو الحائل بين العامة وبين طلب الجحة، والله أعلم.

ولم يختلف العلماء أن العامة عليها تقليد علمائها، انهم المرادون بقول الله عز وجل : "فاسألوا أهل الذكر إن كنتم لا تعلمون"، أجمعوا على أن الأعمى لابد له من تقليد غيره ممن يثق غيره بالقبلة إذا أشكلت عليه ، فكذلك من لا علم له ولابصر بمعنى ما يدري به لابد له من تقليد عالمه وكذلك لم يختلف العلماء أن العامة لايجوز لها الفتيا، وذلك والله أعلم - لجهلها بالمعاني التي منها يجوزالتحليل والتحريم والقول في العلم.

“তাকলীদ নিন্দিত হওয়ার প্রমাণাদি মুজতাহিদগণের জন্য প্রযোজ্য। আর সাধারণজন যে কোনো উদ্ভূত বিষয়ে শরয়ী হুকুম জানার জন্য অবশ্যই আলেমগণের শরণাপন্ন হতে হবে। কারণ তারা দলীলের মর্মোদ্ধার করতে সক্ষম না। তাদের বুঝ ও জ্ঞান ইজতিহাদের স্তর পর্যন্ত পৌঁছতে অক্ষম। ইলমের অনেক স্তর রয়েছে। নিম্নস্তরের জ্ঞান লাভ করা ছাড়া উপরের স্তরে পৌঁছা যায় না। তাদের অজ্ঞতাই শরয়ী দলীলের মর্মোদ্ধারের জন্য প্রতিবন্ধক। এ ব্যাপারে কোন মতানৈক্য নেই যে, সাধারণ মানুষের জন্য মুজতাহিদগণের তাকলীদ করা অপরিহার্য। আর 'আয়াত' থেকে তারাই উদ্দেশ্য।

স্বতসিদ্ধ কথা যে, কিবলা নির্ণয়ের ক্ষেত্রে অন্ধ ব্যক্তির অবশ্যই বিশ্বস্ত কোনো জ্ঞানী ব্যক্তির তাকলীদ করতে হবে। এমনিভাবে যার দ্বীনের জ্ঞান নেই তার কর্তব্য হলো শরয়ী আহকামের ক্ষেত্রে মুজতাহিদের তাকলীদ করা। উলামাদের ঐকমত্য যে, সাধারণ মানুষের জন্য ফতোয়া প্রদান করা জায়েয নাই। কারণ, সে শরয়ী বিধানের দলীল ও তাৎপর্য অনুধাবন করতে অক্ষম। (জামিউ বয়ানিল ইলমি, পৃ ৩৯০)

আল্লামা ইবনে তাইমিয়া রহ. (৭২৮হি.) বলেন:

لا ريب أن كثيرا من الناس يحتاج إلى تقليد العلماء في الأمور العارضة التي لا يستقل هو بمعرفتها. (مجموع الفتاوى ১৯/২৭২)

“এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নাই যে, অনেক মানুষের প্রয়োজন উলামায়ে কেরামের তাকলীদ করা; এমন বিষয়গুলোতে যা সে নিজে নিজে জানতে অক্ষম।” (মাজমুউল ফাতাওয়া)

সালাফী আলেম শায়খ আলবানীও সাধারণ মানুষের জন্য মুজতাহিদের অনুসরণের কথা বলেছেন। ( দ্র. আল-লামাযহাবিয়্যাহ আখতারু বিদআতিন,পৃ.১৩,৩৩)

মোটকথা, যারা ইজতিহাদ করতে পারে না তারা এ ক্ষেত্রে ইমামের শরণাপন্ন হবে, যা একটি স্বতঃসিদ্ধ কথা। ইজতিহাদের যোগ্যতাও নেই আবার ইমামের শরণাপন্ন না হয়েই বিধান উদ্ভাবন করার চেষ্টা তাহরীফ ও দ্বীন বিকৃতির দিকেই ঠেলে দিবে। এমনকি কোনো আলেমও যদি পূর্ববর্তীদের ব্যাখ্যা ও সমাধানের তোয়াক্কা না করে নতুনভাবে গবেষণা শুরু করে তার ভুল হওয়া অবধারিত। বিষয়টির স্পর্শকাতরতা অনুধাবন করেই সালাফী আলেম সালেহ বিন ফাওযান আল-ফাওযান আরেক সালাফী আলেম ইউসুফ আল-কারজাবীর কিতাবের উপর আপত্তি করে উল্লেখ করেছেন:

ولا مناص لكل باحث في أحكام الشريعة الإسلامية من الرجوع إلى آرائهم وأقوالهم، إن كل من سولت له نفسه مخالفة أقوالهم والخروج على آرائهم وقع في الخلط والخبط والتناقض، لأنه ما أحاط بالأدلة إحاطتهم ، ولا فهم النصوص فهمهم، وهم أقرب منه إلى عصور الخير والصفاء تلقيا وفهما .....

“শরীয়তের আহকামের উপর গবেষণাকারীর জন্য অবশ্যই পূর্ববর্তী ইমামগণের ব্যাখ্যা ও সিদ্ধান্তের শরণাপন্ন হতে হবে। যার অন্তর তাঁদের ব্যাখ্যা ও সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধাচরণ করতে তাকে প্রলুব্ধ করে, তার বক্তব্য অবশ্যই বিভ্রান্তিমূলক, অসঙ্গতিপূর্ণ ও পরস্পর বিরোধী হবে। কারণ সে তাঁদের ন্যায় শরয়ী দালায়েলের জ্ঞান রাখে না। এবং তাঁদের ন্যায় 'নুসুস' অনুধাবনের যোগ্যতাও তার নেই। তাঁরা তার চেয়ে আরো উত্তম ও পবিত্র যুগে জ্ঞান আহরণ করেছেন এবং শরীয়তকে বুঝেছেন। (আল-ইলাম বিনাকদিল হালাল ওয়াল হারাম পৃ.৭)

উপরের আলোচনায় চারটি বিষয় পরিষ্কার হলো,

  1. কুরআন-সুন্নাহয় স্পষ্ট বিধানাবলীর ক্ষেত্রে কোনো ইমামের অনুসরণ করার প্রয়োজন নেই।
  2. অস্পষ্ট আয়াত ও হাদীসের ক্ষেত্রে মুজতাহিদ ইমামগণ নিজ ইজতিহাদ অনুসারে আমল করবেন। আর অন্যরা তাদের প্রদত্ত ব্যাখ্যার সাহায্যে আমল করবেন।
  3. ইমামগণের ব্যাখ্যার সাহায্যে কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণকেই তাকলীদ বলা হয়।
  4. যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও যারা ইমাম ও ফকীহর শরণাপন্ন না হয়ে, নিজেই বিধান উদ্ভাবন করার চেষ্টা করে, তাদের এ অপতৎপরতা কুরআন-সুন্নাহ অনুসরণ না হয়ে তার বিরুদ্ধাচরণ হবে। যা সর্বাবস্থায় নিন্দিত।

তাকলীদ ও ইত্তিবার স্বরূপ

পূর্বের আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পেরেছি যে, তাকলীদ কুরআন-সুন্নাহ অনুসরণ করার একটি মাধ্যম। র্অথাৎ কুরআন-সুন্নাহয় কোনো জটিলতা থাকলে ইমামের শরণাপন্ন হয়ে তার নিরসন ও ব্যাখ্যা খোঁজা এবং সে অনুযায়ী কুরআন-সুন্নাহ'র উপর আমল করাই তাকলীদের সরল ব্যাখ্যা। তাকলীদের মাঝে মুখ্য কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণ। এ বাস্তবতাটি হাকীমুল উম্মাহ আশরাফ আলী থানভী রহ. (১৩৬২হি.) এভাবে ব্যক্ত করেছেন:

تقلید کی تفسیر یہ ہے کہ ہم حضور صلی اللہ علیہ وسلم کی احادیث وارشادات پر عمل کرتے ہیں اس تفسیر پر جو امام ابو حنیفہ بیان کی ہے

“তাকলীদের ব্যাখ্যা এই যে, আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস ও নির্দেশনাসমূহ অনূসরণ করি ইমাম আবু হানিফা রহ. প্রদত্ত ব্যাখ্যা অনুযায়ী। (আশরাফুল জাওয়াব ২/১২)

মূলত ইমাম আবু হানীফা রহ. এর ফিকহী ব্যাখ্যা ও সমাধান হাদীসেরই তাফসীর। তাইতো ইমাম ইবনুল মুবারক রহ. (১৮১হি.) বলেছেন:

لا تقولوا رأي أبي حنيفة، بل تفسير الحديث.

“তোমরা ইমাম আবু হানিফা রহ. এর 'রায়' বলো না; বরং বলো 'হাদীসের ব্যাখ্যা"। (ফাযায়েলে আবী হানীফা-ইবনে আবিল আওয়াম)

শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী র. (১১৭৬ হি.) আরো বিস্তারিত বলেছেন। তিনি তাকলীদকে দু' ভাগ করেছেন:

  1. ওয়াজিব তাকলীদ,
  2. হারাম তাকলীদ।

ওয়াজিব তাকলীদের ব্যাখ্যা এভাবে করেছেন,

فأحدهما أن يكون من اتباع الرواية دلالة تفصيله أن الجاهل بالكتاب والسنة لا يستطيع بنفسه التتبع ولا الإستنباط فكان وظيفته أن يسأل فقيها ما حكم رسول الله صلى الله عليه وسلم في مسألة كذا وكذا فإذا أخبر تبعه سواء كان مأخوذا من صريح نص أو مستنبطا منه او مقيسا على المنصوص فكل ذلك راجع إلى الرواية عنه صلى الله عليه وسلم ولو دلالة وهذا قد اتفقت الأمة على صحته قرنا بعد قرن بل الأمم كلها أنفقت على مثله في شرائعهم

“এক প্রকারের তাকলীদ হলো (ওয়াজিব তাকলীদ ) যা হাদীস অনুসরণের মধ্যেই গন্য হবে। তার বিবরণ হলো: কুরআন-সুন্নাহ সম্পর্কে অনভিজ্ঞ ব্যক্তি যেহেতু নিজেই তা থেকে শরয়ী আহকাম উদ্ভাবন ও উদ্ঘাটন করতে সক্ষম না। অতএব, তার দায়িত্ব হলো, সে কোনো ফকীহকে প্রশ্ন করবে, অমুক অমুক মাসআলায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশনা কী? এবং সে ফকীহের ফয়সালা অনুসারে আমল করবে, চাই তাঁর ফয়সালা ‘নসের সুস্পষ্ট হুকুম হোক, কিংবা 'নস' থেকে ইজতিহাদকৃত হোক, অথবা কিয়াসলব্ধ হোক। সব প্রকারেই হাদীসের অনুসরণ গন্য হবে। এ প্রকারের তাকলীদের সিদতার উপর যুগে যুগে উম্মতের ইজমা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বরং সকল উম্মতের ঐকমত্যে এ ধরণের তাকলীদ জায়েয। (ইকদুল জীদ)

তাকলীদের পরিচয় ও গুরুত্ব আশা করি পরিষ্কার হয়েছে। এটাও প্রতিভাত হয়েছে যে, মূল উদ্দেশ্য কুরআন-সুন্নাহ অনুসরণ ইমামগণ ব্যাখ্যাদাতা মাত্র। আল্লামা শাতিবী রহ. এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। (আল-এতিসাম৩/২৫০)

মোটকথা, মুসলমানগণ এ ব্যাখ্যা অনুযায়ী তাকলীদ করে থাকে। যাতে কুরআন-সুন্নাহর দৃষ্টিতে আপত্তি করার কোনো সুযোগ নেই। অথচ 'কিছু ভাই' আছেন যারা মনগড়া কল্পনাপ্রসূত ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে অন্যদের কাঁধে চাপিয়ে দেন। এবং খণ্ডন করতে থাকেন। কাফির, মুশরিক যারা স্বীয় গোত্রের অন্ধ অনুসরণ করে ইসলাম গ্রহণ থেকে বিরত থেকেছে। তাদের প্রতি অবতীর্ণ আয়াত ব্যবহার করা হয় এমন মুসলমানদের জন্য যারা কুরআন সুন্নাহকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করে নিয়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের প্রতি হযরত ইবনে ওমর রা. হুশিয়রী উচ্চারণ করেছেন! ইমাম বুখারী রহ. উল্লেখ করেন:

يراهم - الخوارج - شرار خلق الله، وقال: إنهم انطلقوا إلى آيات نزلت في الكفار، فجعلوها على المؤمنين

"হযরত ইবনে ওমর রা তাদেরকে (খারেজীদের) আল্লাহর সৃষ্টিকুলের মধ্যে সর্বাধিক নিকৃষ্ট মনে করতেন। তিনি বলেন: তারা কাফিরদের ব্যাপারে নাযিলকৃত আয়াতসমূহকে মুসলমানদের উপর চাপিয়ে দেয়।” (সহীহ বুখারী)

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সঠিক বুঝ দান করুন।

তাকলীদের আলোচ্যব্যাখ্যা ও ইত্তিবার মর্ম এক ও অভিন্ন। অনেকে তাকলীদ ও ইত্তিবার মাঝে এভাবে পার্থক্য করতে চান যে, তাকলীদ অন্ধ অনুসরণ বা দলীল ছাড়া অনুসরণ, আর ইত্তিবা দলীলের আলোকে বা দলীল জেনে অনুসরণ। এমন ব্যখ্যা নবআবিষ্কৃত। (আল-লামাযহাবিয়্যা পৃ.৬৯) সালাফের আলোচনায় দলীলভিত্তিক অনুসরণের ক্ষেত্রেও তাকলীদ শব্দ ব্যবহার হয়েছে। এমনকি একজন মুজতাহিদের অন্যের অনুসরণের ক্ষেত্রে তাকলীদ শব্দ ব্যবহার হয়েছে। আল্লামা ইবনুল কাইয়িম রহ. বলেন:

وقد صرح الشافعي بالتقليد فقال: في الضبع بعير قلته تقليدا لعمر. وقال في مسألة بيع الحيوان بالبراءة من العيوب: قلته تقليدا لعثمان. وقال في مسألة الجد مع الإخوة إنه يقاسمهم، ثم قال: وإنما قلت بقول زيد، وعنه قبلنا أكثر الفرائض. وقد قال في موضع آخر من كتابه الجديد: قلته تقليدا لعطاء.

“ইমাম শাফেয়ী রহ. তাকলীদের ব্যাপারে পরিষ্কার বলেছেন। তিনি একস্থানে বলেন: আমি এ হুকুম গ্রহণ করেছি ওমর রা. এর তাকলীদ করে। অপর এক মাসআলায় বলেন: আমি এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি উসমান রা. এর তাকলীদে। অপর এক মাসআলায় বলেছেন, যায়েদ রা. এর অনুসরণে, অপর এক মাসআলায় বলেন: আতা রহ. এর তাকলীদ করে বলেছি।” "( ইলামুল মুওয়াক্কিয়িন)

বরং কুরআনে অন্ধ অনুসরণের ক্ষেত্রেও ইত্তিবা ব্যবহার হয়েছে। যেমন আল্লাহ তআলা বলেন:

إِذْ تَبَرَّأَ الَّذِينَ اتَّبِعُوا مِنَ الَّذِينَ اتَّبَعُوا وَرَأَوُا الْعَذَابَ وَتَقَطَّعَتْ بِهِمُ الْأَسْبَابُ * وَقَالَ الَّذِينَ اتَّبَعُوا لَوْ أَنَّ لَنَا كَرَّةً فَتَتَبَراً مِنْهُمْ كَمَا تَبرَّءُوا مِنا

“অনুসৃতরা যখন অনুসরণকারীদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে যাবে এবং যখন আযাব প্রত্যক্ষ করবে আর বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে তাদের পারস্পরিক সমস্ত সম্পর্ক। এবং অনুসারীরা বলবে, কতইনা ভাল হত, যদি আমাদিগকে পৃথিবীতে ফিরে যাবার সুযোগ দেয়া হত। তাহলে আমরাও তাদের প্রতি তেমনি অসন্তুষ্ট হয়ে যেতাম, যেমন তারা অসন্তুষ্ট হয়েছে আমাদের প্রতি।”

(দ্র. আল-লামাযহাবিয়্যাহ পৃ. ৬৯-৭০, তাকলীদ কী জরুরত)

ইমাম ইবনে আবদুল-বার রহ., খতীব বাগদাদী রহ., আল্লামা ইবনে কাইয়িম রহ.সহ অনেকেই ইমামগণের স্বীকৃত অনুসরণকে তাকলীদ নামেই উল্লেখ করেছেন ।

তবে সবার তাকলীদ এক প্রকার নয়। যেমন: সাধারণ মানুষের তাকলীদ আর 'মুতাবাহহির আলেমের তাকলীদ, এমনিভাবে স্তরভেদে 'মুজতাহিদ ফিল মাযহাব' ও 'মুজতাহিদ ফিল মাসাইল' এর তাকলীদ সমমানের নয়। বিস্তারিত বিবরণ 'উসূলুল ইফতা' ও 'উসূলুল ফিকহ' শিরোনামের কিতাবে উল্লেখ রয়েছে।

সাধারণের জন্য দলীল জানার আবশ্যকীয়তা

সাহাবা ও তাবেঈগণের কর্মধারা ছিল যে, সাধারণজন প্রয়োজনে ইমাম ও ফকীহগণের নিকট সমাধান জিজ্ঞাসা করত, আর তাঁরা সাধ্যমত জবাব দিতেন। জবাবের সাথে প্রমাণ উল্লেখ করার কোন আবশ্যকীয়তা ছিল না।

মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক ও আল আওসাত-ইবনুল মুনযির ইত্যাদি কিতাব খুললেই দেখতে পাবেন যে, এ গ্রন্থগুলোতে সাহাবা ও তাবেঈগণের হাজারও ফতোয়া বর্ণিত হয়েছে, কিন্তু প্রমাণের উল্লেখ নেই। আল্লামা আমিদী রহ. (৬৩১হি.) বলেন:

“আর ইজমার বিবরণ হলো: ( ভিন্নমত পোষণকারীদের আত্মপ্রকাশের পূর্ব পর্যন্ত) সাহাবা ও তাবেঈ যুগে সাধারণ মানুষ মুজতাহিদগণ থেকে ফতোয়া গ্রহণ করত, এবং শরয়ী আহকামের ক্ষেত্রে তাঁদের অনুসরণ করত। মুজতাহিদ ফকীহগণ তাদেরকে দলীল উল্লেখ করা ছাড়াই ফতোয়া প্রদান করতেন। কেউ তাদেরকে এভাবে ফতোয়া প্রদান করা থেকে বারণও করত না, আপত্তিও তুলত না। অতএব এ ব্যাপারে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হলো যে, সাধারণ মানুষ সর্বাবস্থায় (দলীল উল্লেখপূর্বক কিংবা তা ব্যতীতই) মুজতাহিদের অনুসরণ করবে।' (আল-ইহকাম লিল-আমেদী ৩/১৭১)

এছাড়া সর্বদা প্রমাণ উল্লেখ করা বা দলীল জানার আবশ্যক হওয়ার ব্যাপারে কোন পরিষ্কার দলীলও নেই। তা সত্ত্বেও এমন দাবি করা যে, সাধারণজনের জন্য দলীল জানা আবশ্যক, একটি অবাস্তব দাবি। শরীয়ত যা আবশ্যক করেনি তা নিজ থেকে আবশ্যক করার নামান্তর।

তাকলীদ সাহাবা যুগ থেকেই চলে এসেছে

তাকলীদ অনেক পরে আরম্ভ হয়েছে— ব্যাপারটি তা নয়। বরং তাকলীদ সাহাবা যুগেও ছিলো। এমনটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবদ্দশায় তাকলীদ চলমান ছিলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন অঞ্চলে একেক জন সাহাবীকে প্রেরণ করতেন আর সেই অঞ্চলের মানুষ তাকে অনুসরণ করতো। হাদীস ও সীরাতের কিতাব এমন অসংখ্য উদাহরণ বিদ্যামন রয়েছে।

শায়েখ মুহাম্মদ বিন সালেহ আলউছাইমীন রহ. বলেন:

والتقليد في الواقع حاصلٌ من عهد الصحابة رضي الله عنهم فإن الله تعالى يقول (فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِنْ كُنْتُمْ لا تَعْلَمُونَ) ولا شك أن من الناس في عهد الصحابة رضي الله عنهم وإلى عهدنا هذا من لا يستطيع الوصول إلى الحكم بنفسه لجهله وقصوره ووظيفة هذا أن يسأل أهل العلم وسؤال أهل العلم يستلزم الأخذ بما قالوا والأخذ بما قالوا هو التقليد. (فتاوى نور على الدرب للعثيمين ২/২২০)

“বাস্তবে তাকলীদ সাহাবা যুগ থেকেই চলে আসছে। কেননা, সাহাবীদের যুগ থেকে আমাদের পর্যন্ত প্রত্যেক সময়েই এমন মানুষ ছিলো, যারা নিজে নিজে কুরআন হাদীস গবেষণা করে বিধান জানতে সক্ষম নয়, নিজের অজ্ঞতা ও যোগ্যতার অভাবের কারণে। আর তাদের কর্তব্য হলো আহলে ইলমকে জিজ্ঞাসা করা। আহলে ইলমকে জিজ্ঞাসা করা মানে তাদের কথা মানা। আর এটিই হলো তাকলীদ।” ( ফাতাওয়া নুর আলাদ-দারব ২/২২০)

মাযহাবও সাহাবী যুগ থেকেই চলে এসেছে

মাযহাব চারশত বছর পরে আরম্ভ হয়েছে বা মাযহাব ইমাম আবু হানীফার যুগে আরম্ভ হয়েছে— এমন দাবি ভিত্তিহীন। বরং মাযহাব ও মাহাবের অনুসরণ সাহাবা যুগ থেকেই চলে এসেছে। ফকীহ সাহাবীদের মাযহাব ছিলো এবং অন্যরা তার অনুসরণও করতো। খোদ সালাফী আলেমগণও তাদের রচিত কিতাবে সাহাবা ও তাবেঈগণের অনেক মাযহাব উল্লেখ করেছেন। যেমন: আল্লামা ইবনুল কায়্যিম রহ. এক মাসআলা বর্ণনার পর বলেন:

وهو مذهب الحسن وطاؤوس وعكرمة وقتادة والحكم.

এটি হাসান রহ., তাউস রহ. ইকরিমা রহ. কাতাদা রহ., ও হাকাম রহ. এর মাযহাব’ (যাদুল মাআদা ৫/১২৬)

তিনি অন্য আর একটি মাসআলা প্রসঙ্গে বলেন:

وهذا مذهب ابن عباس وجابر بن عبد الله وطاؤوس...

এটি ইবনে আব্বাস রা. জাবের বিন আবদুল্লাহ রাহ. তাউস রহ... এর মাযহাব’ (যাদুল মাআদ ১/৫১২)

তিনি ভিন্ন একটি মাসআলা প্রসঙ্গে বলেন:

فإنه مذهب أبي هريرة وعمر بن الخطاب وابنه عبد الله وعمرو بن العاص وأنس ومعاوية وعائشة وأسماء.

এটি আবু হুরায়রা রা., উমর ইবনুল খাত্তাব রা., তার পুত্র আব্দুল্লাহ রা., আমর ইবনুল আস রাহ. আনাস রা. মুআবিয়া রা. আলেশা রা. আসমা রা. এর মাযহাব’ (তাহযীবু সুনানে আবী দাউদ ২/২৮৫)

আল্লামা ইবনে তায়মিয়া রহ. এক মাসআলা প্রসঙ্গে বলেন:

هذا مذهب الصحابة والتابعين

‘এটি সাহাবী ও তাবেঈগণের মাযহাব।’

অন্য একটি মাসআলা প্রসঙ্গে বলেন:

وهو مذهب كثير من الصحابة والتابعين.

‘এটি অনেক সাহাবী ও তাবেয়ীগণের মাযহাব’ (মাজমুউল ফাতাওয়া ২৫/৯৯)

ইমাম বুখারী রহ. এর উস্তাদ হযরত ইমাম আলী ইবনে মাদীনী রহ. (১৬০-২৩৪হি.) সাহাবা যুগে মাযহাবের ভিন্নতা ও সুনির্দিষ্ট মাযহাবকে কেন্দ্র করে শরিয়ত চর্চা, ফতোয়া প্রদান ও আমল সম্পর্কে বলেন:

لم يكن في أصحاب رسول الله صلى الله عليه وسلم من له صحيبة يذهبون ،مذهبه ويفتون بفتواه، ويسلكون طريقته إلا ثلاثة عبد الله بن مسعود وزيد بن ثابت، وعبد الله بن عباس. فأصحاب عبد الله بن مسعود الذين يفتون بفتواه، ويقرؤون بقراءته: علقمة بن قيس والأسود بن يزيد ومسروق ...

وأصحاب ابن عباس الذين يذهبون ،مذهبه ويسلكون طريقه عطاء وطاوس ومجاهد وجابر بن زيد وعكرمة..

وأصحاب زيد بن ثابت الذين كانوا يأخذون عنه، ويفتون بفتواه منهم من لقيه ومنهم من لم يلقه اثنا عشر رجلا سعيد بن المسيب...

“রাসূলুল্লাহ এর সাহাবীগণের মাঝে তিনজন ফকীহ সাহাবী এমন ছিলেন, যাদের শাগরিদগণ তাঁদের মাযহাব অনুসরণ করতেন, তাঁদের মত ও সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফতোয়া দিতেন এবং তাদের তরীকা অনুকরণ করতেন। তাঁরা হলেন, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা., যায়েদ ইবনে ছাবেত রা. ও আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.।

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. এর অনুসারীগণ যাঁরা তাঁর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফতোয়া দিতেন এবং তাঁর কিরাত অনুযায়ী মানুষকে কুরআন শিখাতেন। তারা ছিলেন, আলকামাহ, আসওয়াদ, মাসরুক...। তদ্রূপ আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. এর যে শাগরিদগণ তাঁর মাযহাব অনুসরণ করতেন এবং তাঁর তরীকা অবলম্বন করতেন তারা হলেন : হযরত আতা, তাউস, মুজাহিদ, জাবের, ইকরিমা। অনুরূপ যায়েদ ইবনে ছাবিত রা. এর যে শাগরিদগণ তাঁর নিকট জ্ঞানার্জন করতেন বা তাঁর ইলমের চর্চা করতেন এবং তাঁর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফতোয়া প্রদান করতেন, তাদের মধ্যে কেউ তাঁর সাক্ষাৎলাভ করেছেন আর কেউ তাঁর সাক্ষাৎ লাভ করেননি, যার সংখ্যা বার জন । (ইলালে ইবনুল মাদীনী,পৃ. ৬৫-৭৩)

বিশিষ্ট হাদীস বিশারদ আল্লামা শামসুদ্দীন সাখাবী রহ. ইমাম আলী ইবনুল মাদীনী রহ. (১৬১হি.-২৩৪হি.) এর বক্তব্যটি খুব সংক্ষেপ উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন::

فهم كالمقلَّدين، وأتباعهم كالمقلِّدين لهم. (فتح المغيث)

সাহাবা যুগে মাযহাব ছিলো এবং তার অনুসরণও হতো— একথা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। এ প্রসঙ্গে আরও দুএকটি দিক উল্লেখ করা যেতে পারে।

এক. মদীনাবাসী যায়েদ বিন ছাবিত রা. এর ফিকহের উপরই সন্তুষ্ট ছিল। কখনো অন্য সাহাবীর সাথে দ্বিমত হলে হযরত যায়েদ রা. এর মতই গ্রহণ করত। হজ্জ সংক্রান্ত একটি মাসআলায় ইবনে আব্বাস রা. যায়েদ রা. এর মতের ভিন্নমত পোষণ করলে তারা তা গ্রহণ না করে হযরত যায়েদ রা. এর সিদ্ধান্তই গ্রহণ করেছিল। হযরত ইকরিমা রহ. বলেন:

إن أهل المدينة سألوا ابن عباس رضي الله عنهما، عن امرأة طافت ثم حاضت، قال لهم: تنفر، قالوا: لا نأخذ بقولك وندع قول زيد

“মদীনাবাসী হযরত ইবনে আব্বাস রা. কে তাওয়াফ করার পর ঋতুবর্তী হয়েছে এমন মহিলা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলো যে, তার কর্তব্য কী? তিনি তাদেরকে বললেন, সে রওয়ানা হয়ে যাবে। তারা বললো, আমরা যায়েদ ইবনে ছাবিতের মত ছেড়ে আপনার মত গ্রহণ করবো না। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৭৫৮)

আবদুল ওয়াহহাব আস-সাকাফী এর সূত্রে এভাবে বর্ণিত হয়েছে,

لا نبالي أفتيتنا أو لم تفتنا، زيد بن ثابت يقول : لا تنفر.

“আপনি ফতোয়া দেন বা না দেন আমরা তা গ্রহণ করব না। যায়েদ ইবনে সাবিত রা. ফতোয়া দিয়েছেন যে, সে রওয়ানা হবে না।" (ফাতহুল বারী ,পৃ. ৩/৪৬৮)

এ হাদীস থেকে দু'টি বিষয় বুঝে আসে:

  1. মদীনাবাসী যায়েদ বিন ছাবিত রা. এর ফিকহের উপরই সন্তুষ্ট ছিল। শরয়ী সমাধানের ক্ষেত্রে তার সমাধানই তাদের নিকট গৃহীত হত।
  2. ইবনে আব্বাস রা.ও একারণে তাদেরকে নিন্দা বা সতর্ক করেননি।

দুই. ইয়ামানের অধিবাসীরা শুধু মু'আয বিন জাবাল রা. এর অনুসরণ করত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে শাসক, শিক্ষক ও মুফতী হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। এবং কুরআন-সুন্নাহর পাশাপাশি কিয়াস ও ইজতিহাদের ভিত্তিতে ফতোয়া ও ফয়সালা দেয়ার অনুমতি প্রদান করেছেন।

তিনি এর ভিত্তিতে সমাধান দিতেন এবং ইয়ামানবাসীও তাঁকে অনুসরণ করেই দ্বীনের উপর চলত। তাঁর বর্তমানে অন্য ফকীহর শরণাপন্ন হওয়ার নযীর পওয়া যায় না। বরং হযরত উমর রা. যখন তার খেলাফতকালে শাম দেশে যান, তখন সেখানে জনসাধারণের সামনে ঘোষণা দেন-

من كان يريد أن يسأل الفقه فليأت معاذ بن جبل.

“যার মাসআলা জানার প্রয়োজন সে যেন মুআয বিন জাবালের কাছে জিজ্ঞেস করে।” (মাজমাউয যাওয়ায়েদ-৫৬৭)

তিন. অনেক সময় খলীফার পক্ষ থেকে বিশেষ মুফতীকে নির্দিষ্ট করে ঘোষণা দেয়া হতো যে, নির্দিষ্ট মুফতী ছাড়া অন্য কেউ যেন ফতোয়া না দেয়। আল্লামা ইবনুল ইমাদ রহ. (১০৮৯ হি.) উল্লেখ করেন:

لقد انفرد عطاء بن أبي رباح ومجاهد بالفتوى في مكة، وكان يصيح منادي الخليفة أن لا يفتي الناس إلا أحد هذين الإمامين...اهـ

“আতা ইবনু আবী রবাহ রহ. ও মুজাহিদ রহ. এ দু'জনই শুধু মক্কায় ফতোয়া প্রদান করতেন। খলীফার ঘোষক এভাবে ঘোষণা করত, এ দু'জন ইমাম ব্যতীত অন্য কেউ যেন ফতোয়া প্রদান না করে। (শাযারাতুয যাহাব; দ্র. আল-লামাযহাবিয়্যাহ পৃ. ৭৯)

আশা করা যায়, আমরা বুঝতে পেরেছি যে, সাহাবাযুগেও কুরআন-সুন্নাহর ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যক্তি বা 'মাকতাবায়ে ফিকর' এর অনুসরণ হত। এ পদ্ধতিতে অনুসরণ নতুন বা চতুর্থ শতাব্দীর পরের আবিষ্কার নয়। বরং এপদ্ধতিকে অস্বীকার করা বা হারাম ও নাজায়েয বলা পরবর্তী যুগে শুরু হয়েছে, যা বিদআতের আওতায় পড়ে।

‘মাযহাব নবআবিষ্কৃত‘ শিয়াদের দাবি

শীআ-ফেরকার পক্ষ থেকে মাযহাব সম্পর্কে এ আপত্তি উত্থাপন করা হয় যে, মাযহাব রাসূল ও সাহাবা যুগে ছিল না। পরবর্তীতে আবিষ্কৃত হয়েছে। এর জবাবে আল্লামা ইবনে তাইমিয়া রহ. (৭২৮ হি.) বলেন:

قوله: " إن هذه المذاهب لم تكن في زمن النبي - صلى الله عليه وسلم - ولا الصحابة.

إن أراد أن الأقوال التي لهم لم تنقل عن النبي - صلى الله عليه وسلم - ولا عن الصحابة ، بل تركوا قول النبي - صلى الله عليه وسلم - والصحابة وابتدعوا خلاف ذلك، فهذا كذب عليهم. فإنهم لم يتفقوا على مخالفة الصحابة، بل هم -[وسائر أهل السنة] متبعون للصحابة في أقوالهم ، وإن قدر أن بعض أهل السنة خالف الصحابة لعدم علمه بأقاويلهم، فالباقون يوافقونهم ويثبتون خطأ من يخالفهم، وإن أراد أن نفس أصحابها لم يكونوا في ذلك الزمان فهذا لا محذور فيه. فمن المعلوم أن كل قرن يأتي يكون بعد القرن الأول...

قوله: " وأهملوا أقاويل الصحابة " كذب منه، بل كتب أرباب المذاهب مشحونة بنقل أقاويل الصحابة والاستدلال بها، وإن كان عند كل طائفة منها ما ليس عند الأخرى.

وإن قال: أردت بذلك أنهم لا يقولون: مذهب أبي بكر وعمر ونحو ذلك، فسبب ذلك أن الواحد من هؤلاء جمع الآثار وما استنبطه منها، فأضيف ذلك إليه، كما تضاف كتب الحديث إلى من جمعها، كالبخاري ومسلم وأبي داود، وكما تضاف القراءات إلى من اختارها كنافع وابن كثير.

وغالب ما يقوله هؤلاء منقول عمن قبلهم، وفي قول بعضهم ما ليس منقولا عمن ، قبله لكنه استنبطه من تلك الأصول.اه مختصرا

“তাদের দাবি যে, এ মাযহাব চতুষ্টয় রাসূল ও সাহাবা যুগে ছিল না। এর দ্বারা যদি উদ্দেশ্য হয় যে, মাযহাবের ইমামদের মতামত রাসূল বা সাহাবা রা. থেকে অনুসৃত নয় বরং নবআবিষ্কৃত— তাহলে তাদের এ দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা। কারণ, কেউই সাহাবা বিরোধিতার ব্যাপারে একমত হন নাই। সকলেই সাহাবা রা. এর অনুসারী। কেউ কোনো কারণে দ্বিমত পোষণ করলেও অন্যরা তার সাথে একমত হন নাই ।

আর যদি তাদের উদ্দেশ্য হয় মাযহাবের ইমামগণ ঐ যামানায় জন্মলাভ করেন নাই। এতে দোষের কিছু নেই। কারণ, প্রত্যেক পরবর্তীগণ পূর্বে বিদ্যমান থাকেন না।

তাদের দাবি যে, মাযহাবের ইমামগণ সাহাবা রা. এর ফাতাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। এ আপত্তিও অবাস্তব। কারণ, মাযহাবের কিতাবগুলো সাহাবাদের ফাতাওয়া দিয়ে পূর্ণ, যা দ্বারা তারা প্রমাণ পেশ করেছেন। যদিও একজন এক মত গ্রহণ করেছেন, আর অন্যজন ভিন্ন মত গ্রহণ করেছেন। আর যদি তাদের উদ্দেশ্য হয় যে, আবু বকর রা. বা ওমর রা, এর মাযহাব বলা হয় না কেন? (বরং হানাফী মাযহাব, শাফেঈ মাযহাব বলা হয়।) এর কারণ হলো, এ সকল ইমামগণ আছার একত্রিত করেছেন এবং ইজতিহাদ করেছেন। তাই তাদের প্রতি সম্বন্ধ করা হয়। যেমন হাদীসের কিতাবসমূহে সংকলকের দিকে নিসবত করে বুখারী, মুসলিম ও আবু দাউদের হাদীস বলা হয়। (মিনহজুস-সুনড়বাতিন-নবাবিয়্যাহ, ৩/৪০৯-৪১০)

নির্দিষ্ট মাযহাব অনুসরণের প্রয়োজনীয়তা

যামানার পরিবর্তন একটি বাস্তবতা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম তিন যুগকে খায়েরের যুগ বলেছেন। পরবর্তীতে মিথ্যার বিস্তার হবে তাও বলে গেছেন। সুতরাং প্রথম তিন যুগের কিছু কর্মধারা স্ব স্ব রীতি-নীতি, মান ও স্তরসহ পরবর্তী যুগেও প্রয়োগ করা সম্ভব হয়নি। যুগের পরিবর্তন ও প্রয়োজনে শাখাগত কিছু বিষয়ে পরিবর্তন এসেছে। মানুষের মাঝে দ্বীনের শিথিলতা ও প্রবৃত্তির ব্যাপক অনুসরণের প্রবণতা দেখা দিয়েছে। যেমন: হযরত ওমর রা. এর যুগে মহিলাদের মসজিদে গমন। হাদীস গ্রহণের ক্ষেত্রে রাবীর অতিরিক্ত খোঁজ-খোবর নেয়া।

এরই ধারাবাহিকতায় মানুষের মাঝে যখন স্বেচ্ছাচারিতা ও প্রবৃত্তির অনুসরণ দিন দিন বেড়েই যাচ্ছিল। যা হারাম হওয়াটা অকাট্য দলীল দ্বারা প্রমাণিত। প্রবণতা এত বেশী ছিল যে, এভাবে মানুষকে উন্মুক্ত ছেড়ে দিলে তারা হালালকে হারাম আর হারামকে হালাল করতে কোনো দ্বিধাই করবে না। সুতরাং দ্বীনকে খেলনা বানানো থেকে বিরত রাখার নিমিত্তে পরবর্তী ইমামগণ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, পরবর্তী যুগে সাহাবা, তাবেঈ যুগে অনুসৃত তাকলীদের দ্বিতীয় পদ্ধতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে। অর্থাৎ কোনো এক মাযহাবের সহযোগিতা গ্রহণ করেই আমল করতে হবে।

শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী রহ. (১১৭৬ হি.) মাযহাব মানার উপকারিতা ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে একাধিক দলীল, প্রমাণ উল্লেখ করার পূর্বে ভূমিকা হিসাবে বলেন:

اعلم أن في الأخذ بهذه المذاهب الأربعة مصلحة عظيمة وفي الإعراض عنها كلها مفسدة كبيرة

“নিশ্চয় এই মাযহাব চতুষ্টয়ের কোনো একটিকে অনুসরণ করার মাঝে বৃহত্তম কল্যাণ নিহিত আছে। পক্ষান্তরে কোনো একটিকেও অনুসরণ না করার মাঝে বড় ফেতনা ফাসাদ রয়েছে।' ( ইকদুল জীদ,পৃ.৪০, মাকতাবায়ে দারুল ফাত্হ)

সাহাবা, তাবেঈ ও পরবর্তী যুগে অনেক মাযহাব ছিল। কিন্তু সবগুলো ধারাবাহিকভাবে বাকি থাকেনি। শরিয়তের সকল বিষয়ের সমাধানের উপকরণও তাতে বিদ্যমান নেই। কেবলমাত্র চার মাযহাব যা অদ্যাবধি জারী আছে। যাতে শরিয়তের যেকোনো বিষয়ের সমাধানের পর্যাপ্ত ব্যবস্থাও আছে। তাই পরবর্তী ইমামগণ এই চার মাযহাবের যেকোনো একটার অনুসরণ করার তাকিদ দিয়েছেন। ইমাম শামসুদ্দীন যাহাবী রহ. (৭৪৮ হি.) বলেন:

ويجب علينا أن نعتقد أن الأئمة الأربعة والسفيانين والأوزاعي وداود الظاهري وإسحاق بن راهويه وسائر الأئمة على هدى ... وعلى غير المجتهد أن يقلد مذهبا معينا ... لكن لا يجوز تقليد الصحابة وكذا التابعين كما قاله إمام الحرمين من كل من لم يدون مذهبه فيمتنع تقليد غير الأربعة في القضاء والافتاء لأن المذاهب الأربعة انتشرت وتحررت حتى ظهر تقييد مطلقها وتخصيص عامها بخلاف غيرهم لانقراض اتباعهم وقد نقل الإمام الرازي رحمه الله تعالى إجماع المحققين على منع العوام من تقليد أعيان الصحابة وأكابرهم انتهى

“আমাদের এ বিশ্বাস রাখতে হবে যে, ইমাম চতুষ্টয় সুফিয়ান সাওরী, সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা, আওয়াঈ, দাউদ যাহেরী, ইসহাক ইবনে রাহুয়াহসহ সকল ইমামগণ হেদায়তের ইপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন।... যে ব্যক্তি মুজতাহিদ নয় তার জন্য আবশ্যক কোনো ইমামের তাকলীদ করা। ইমামুল হারামাইনের মতে সাহাবা, তাবেঈ বা এমন ইমাম যার মাযহাব সংকলিত ও সংরক্ষিত হয়নি তার তাকলীদ করা যাবে না। বিচার ও ফতোয়ার ক্ষেত্রে ইমাম চতুষ্টয় ব্যতীত অন্য করো তাকলীদ করা যবে না। কারণ, এই চার মাযহবই সংকলিত হয়ে সর্বত্র প্রচারিত হয়েছে। তার পরিভাষা, রীতি-নীতি ও ধরণ সর্বজন বিদিত। যা অন্য মাযহাবের ক্ষেত্রে হয়নি। ইমাম রাযী রহ. বলেছেন, সাধারণজনদের সাহাবার তাকলীদ নিষেধ হওয়ার ব্যাপারে ইজমা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। (ফয়জুল কাদীর, পৃ. ১/২১০)

আল্লামা ইবনে খালদুন রহ. (৮০৮হি.) চার মাযহাবের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকার কারণ ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বলেন:

وقف التقليد في الأمصار عند هؤلاء الأربعة ودرس المقلدون لمن سواهم وسد الناس باب الخلاف و طرقه لما كثر تشعب الاصطلاحات في العلوم. و لما عاق عن الوصول إلى رتبة الاجتهاد و لما خشي من إسناد ذلك إلى غير أهله و من لا يوثق برأيه و لا بدينه فصرحوا بالعجز والإعواز و ردوا الناس إلى تقليد هؤلاء كل من اختص به المقلدين. وحظروا أن يتداول تقليدهم لما فيه من التلاعب

"অবশেষে তাকলীদ চার ইমামের মাঝেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। আর অন্যান্য ইমামগণের অনুসারীদের অস্তিত্ব হারিয়ে যায়। মানুষ বিরোধিতার দরোজাকেও রুদ্ধ করে দেয়। কেননা, দ্বীনী ইলমের পরিভাষাসমূহের বিভিন্নতা ও জটিলতা রূপ নেয়, এর ফলে ইজতিহাদের স্তর পর্যন্ত পৌঁছা অত্যন্ত কঠিন হয়ে ওঠে। সাথে সাথে অযোগ্যের, অনাস্থাবান ও দ্বীনহীন ব্যক্তির পক্ষ হতে ইজাতহাদে অনাধিকার চর্চার ভয় হওয়ায় আলেমগণ তাদের অক্ষমতার কথা ঘোষণা করে দিয়েছে। আর সাধারণদেরকে চার মাযহাবের কোনো একটির দিকে ফিরিয়ে দেন। তাঁরা সতর্ক করে দেন যে, ইচ্ছাদিনভাবে কোনো এক মাযহাব গ্রহণ করতে পারবে না। যাতে করে ইসলাম খেলনায় পরিণত না হয়ে যায়।" (মুকাদ্দামাতু ইবনে খালদুন, পৃ. ৪৪৮)

ইত্যাকার পরিস্থিতিতে মানুষকে উন্মুক্তভাবে ছেড়ে দেয়ার ভয়াবহতা ও খারাপ পরিণতির আলোচনা করতে গিয়ে ইমাম নবাবী রহ. (৬৭৬ হি.) বলেন:

ووجهه أنه لو جاز اتباع أي مذهب شاء لا فضى إلى أن يلتقط رخص المذاهب متبعا هواه ويتخير بين التحليل والتحريم والوجوب والجواز وذلك يؤدي إلى انحلال ربقة التكليف بخلاف العصر الأول فإنه لم تكن المذاهب الوافية بأحكام الحوادث مهذبة وعرفت فعلى هذا يلزمه أن يجتهد في اختيار مذهب يقلده على التعيين

"(নির্দিষ্ট মাযহাব অনুসরণ করা ওয়াজিব হওয়ার কারণ হলো, যদি মানুষকে যে কোনো মাযহাব অনুসরণ করার অনুমতি দেয়া হয় তাহলে মানুষ প্রবিত্তির তারণায় প্রতিটি মাযহাবের রখসত (বিকল্প হিসাবে অনুমদিত ) বিধান খুঁজে বের করে শুধুতার উপরেই আমল করবে। হালাল, হারাম, জায়েয ও না জায়েযের ব্যাপারে পূর্ণ স্বাধীন হয়ে পড়বে। এক সময় শরিয়ত থেকেই হাত ধুয়ে ফেলবে। এর বিপরীত প্রথম যুগ, কেননা তখন মাযহাব পূর্ণরূপে সংকলিত ও বিন্যাস্ত ছিল না। সুতরাং এখন কোনো একটি মাযহাবেরই তাকলীদ করতে হবে।” (আল-মাজমু শারহুল মুহায্যাব, পৃ. ১/৯১)

আল্লামা ইবনে তাইমিয়া রহ. (৭২৮ হি.) এ ক্ষেত্রে উদাহরণ উল্লেখ করে, এমন স্বেচ্ছাচারিতা নিষেধ হওয়ার উপর ইজমা নকল করেছেন। তিনি বলেন:

ونظير هذا أن يعتقد الرجل ثبوت شفعة الجوار إذا كان طالبا لها وعدم ثبوتها إذا كان مشتريا فإن هذا لا يجوز بالإجماع وكذا من بنى على صحة ولاية الفاسق في حال نكاحه وبنى على فساد ولايته في حال طلاقه لم يجز ذلك باجماع المسلمين ولو قال المستفتي المعين : أنا لم أكن أعرف ذلك وأنا من اليوم ألتزم ذلك لم يكن ذلك لأن ذلك يفتح باب التلاعب بالدين وفتح الذريعة إلى أن يكون التحليل والتحريم بحسب الأهواء

(আল- ফাতাওয়া আল-কুবরা, ২/২৮৫-২৮৬)

এ বিষয়ে সচেতন আলেম মাত্রই আলোচনা করেছেন । সবার বক্তব্য উদ্ধৃত করতে স্বতন্ত্র একটি কিতাবের প্রয়োজন। এখানে শাহ ওলীউল্লাহ দেহলভী রহ. ( ১১৭৬ হি.) এর আলোচনা উল্লেখ করেই শেষ করছি। তিনি বলেন,

قلت الواجب الأصل هو أن يكون في الأمة من يعرف الأحكام الفرعية من أدلتها التفصيلية أجمع على ذلك أهل الحق ومقدمة الواجب واجبة فإذا كان للواجب طرق متعددة وجب تحصيل طريق من تلك الطرق من غير تعيين وإذا تعين له طريق واحد وجب ذلك الطريق بخصوصه

“মূল ওয়াজিব হলো উম্মাতের মাঝে এমন কিছু লোক থাকা যারা শরিয়তের বিধি-বিধান বিস্তারিত দলীল থেকে আহরণের যোগ্যতা রাখে। এটা আহলে হকের স্বতঃসিদ্ধ বিষয়। আর ওয়াজিবের পূর্বশর্তও ওয়াজিব বলেই পরিগণিত হয়। যদি একটি ওয়াজিব আদায় করার একাধিক পদ্ধতি থাকে তাহলে যেকোনো একটি গ্রহণ করলেই ওয়াজিবের দাবি পূর্ণ হয়ে যাবে। কিন্তু যদি সেই ওয়াজিব আদায় করার একটি মাত্র পথ ও পন্থা থাকে তাহলে কেবল তাই অবলম্বন আবশ্যক।” (আল-ইনসাফ ফী বয়ানি আসবাবিল ইখতিলাফ)

সালাফী আলেমদের দৃষ্টিতে মাযহাব অনুসরণ

বর্তমানের সালাফী আলেমগণও মাযহাব মানেন এবং মাযহাবকে মান্য করেন। বর্তমান সালাফীদের ইমাম শায়েখ মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব আননাজদী রহ. তিনি নিজেও হাম্বলী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন এবং অন্যান্য মাযহাবকে সম্মান করতেন। মুসলমানদেরকে চার মাযহাবের কোনো একটি মানতে বলতেন বরং বাধ্য করতেন। তিনি বলেন:

ونحن أيضا في الفروع، على مذهب الإمام أحمد بن حنبل، ولا ننكر على من قلد أحد الأئمة الأربعة، دون غيرهم، لعدم ضبط مذاهب الغير، الرافضة، والزيدية، والإمامية، ونحوهم، ولا نقرهم ظاهرا على شيء من مذاهبهم الفاسدة، بل نجبرهم على تقليد أحد الأئمة الأربعة.

“ফিকহী বিষয়ে আমরাও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. এর মাযহাবের অনুসারী। যারা চার মাযহাবের কোনো মাযহাবের তাকলীদ করে আমরা তাদের উপর কোনো আপত্তি করি না। আর যেমন, যায়দিয়া, ইমামিয়া, শিয়া ইত্যাদি; তাদের বাতিল মাযহাবকে আমরা স্বীকৃতি দিই না। বরং তাদেরকে চার ইমামের কোনো ইমামের তাকলীদ করতে বাধ্য করি। (আদ্দুরারুস সানিয়া ১/১২৭)

কেউ যদি বলে, আমার যখন যে আলেমের কাছে ফতোয়া জানতে মন চায় তার কাছে জিজ্ঞাসা করবো— এতে অসুবিধা কীসের? এর জবাবে শায়েখ মুহাম্মাদ বিন সালেহ আলউছাইমীন রহ. বলেন::

فالعامة مذهبهم مذهب علمائهم، ولهذا لو قال لنا قائل: إنني أشرب الدخان؛ لأن في البلاد الإسلامية الأخرى من يقول: إنه جائز، وأنا لي حرية التقليد.

قلنا: لا يسوغ لك هذا؛ لأن فرضك أنت هو التقليد، وأحق من تقلد علماؤك...فالعامي يجب عليه أن يقلد علماء بلده الذين يثق بهم. وقد ذكر هذا شيخنا عبد الرحمن بن سعدي رحمه الله، وقال: العامة لا يمكن أن يقلدوا علماء من خارج بلدهم؛ لأن هذا يؤدي إلى الفوضى والنزاع.

ولو قال: أنا لا أتوضأ من لحم الإبل؛ لأنه يوجد من علماء الأمصار من يقول: لا يجب الوضوء منه، ولقلنا: لا يمكن، يجب عليك أن تتوضأ لأن هذا مذهب علماءك وأنت مقلد لهم.

‘...তোমার জন্য এর কোনো বৈধতা ও সুযোগ নেই। কেননা, তোমার কর্তব্য হলো তাকলীদ করা আর তোমার দেশের আলেমগণই হলো তোমার জন্য তাকলীদের অধিক উপযোগী। তুমি যদি নিজের দেশের বাইরের আলেমদের তাকলীদ কর, তাহলে তা এমন দ্বন্দ্ব ও লাগামহীনতার দিকে নিয়ে যাবে, যা শরয়ী দলিল বহির্ভূত, যার কোনো দলিল নেই। সুতরাং মুসলিম জনসাধারনের কর্তব্য হলো, তাদের দেশের আলেমদের তাকলীদ করা।....’(লিকাউল বাবিল মাফতুহ-শামিলা)

শায়েখ সালেহ ফাওযান মাযহাব মানার গুরুত্ব বুঝাতে গিয়ে বলেন:

هاهم الأئمة من المحدثين الكبار كانوا مذهبيين، فشيخ الإسلام ابن تيمية وابن القيم كانا حنبليين، والإمام النووي وابن حجر شافعيين والإمام الطحاوي كان حنفيا وابن عبد البر كان مالكيا.

“বড় বড় হাদীস বিশারদ ইমামগণ মাযহাবের অনুসারী ছিলেন। শায়খুল ইসলাম ইবতে তায়মিয়া রহ. এবং ইবনুল কায়্যিম রহ. ছিলেন হাম্বলী, ইমাম নববী রহ. ও ইবনে হাজার রহ. ছিলেন শাফেয়ী, ইমাম তাহাবী রহ. ছিলেন হানাফী, ইবনে আব্দুল বার ছিলেন মালেকী।’ (ইয়ানাতুল মুসতাফীদ ১/১২)

মাযহাব একাধিক হওয়া কি দোষের কিছু?

অনেকে বলে থাকে যে, দীন এক আল্লাহ এক, রাসূল এক, তাহলে মাযাহাব একাধিক কেনো? এভাবে একাধিক মাযহাবের উপর আপত্তি করে থাকে। মুলত কুরআন-সুন্নাহয় উল্লেখিত বিধানের ধরন ও আহরণ পদ্ধতি না জানার করণেই তাদের মনে এ ধরনের প্রশ্ন সৃষ্টি হয়। মূল আলোচনার পূর্বে বলে রাখি যে, আল্লাহ এক হলেই কি আল্লাহ পর্যন্ত পৌছার রাস্তাও এক হওয়া আবশ্যক? একাধিক রাস্তায় কি আল্লাহকে অনুসরণ করা নিষিদ্ধ? অথচ আল্লাহ তাআলা নিজেই কুরআনুল কারীমে তার পর্যন্ত পৌছার রাস্তা একাধিক বলেছেন। ইরশাদ হয়েছে:

وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا

অনত্র ইরশাদ হয়েছে:

يَهْدِي بِهِ اللَّهُ مَنِ اتَّبَعَ رِضْوَانَهُ سُبُلَ السَّلَامِ

আরও ইরশাদ হয়েছে:

وَمَا لَنَا أَلَّا نَتَوَكَّلَ عَلَى اللَّهِ وَقَدْ هَدَانَا سُبُلَنَا

সুতরাং কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত ও স্বীকৃত একাধিক মাযহাবকে অস্বীকার করা বা আল্লাহ এক তাই মাযহাবও এক হতে হবে— এমন কথা বলা অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য।

এ ক্ষেত্রে প্রকৃত বাস্তবতা ও স্বতঃসিদ্ধ বিষয় হলো, শরিয়াতের দলীল দু' ধরণের ।

১. বায়্যিনাত: অর্থাৎ দলীলগুলো এতটাই অকাট্য যে, ভুল বুঝাবুঝির বা একাধিক বুঝের কোন সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে সুন্নাহ একটিই, সবার মাযহাবও এক ও অভিন্ন। ইসলামের সকল মৌলিক আকাঈদ এবং শরিয়তের সকল অকাট্য মাসআলা এর অন্তর্ভুক্ত যেখানে দলীলভিত্তিক কোনো ইখতিলাফ-মতভেদ হতেই পারে না। এজন্য এসব বিষয়ে ইমামগণের মাঝে কোনো মতভেদ নেই। কেউ মতভেদ করলে তা অবশ্যই হঠকারিতা। কুরআনে বায়্যিনাত অকাট্য দলীল থাকার পরও ইখতিলাফ করা বা দলীল থেকে সরে আসাকে নিন্দা করা হয়েছে।

২. যন্নিয়্যাত: যে সকল দলীলের মাঝে কোনো না কোনোভাবে অস্পষ্টতা আছে। মর্মোদ্ধার বা প্রামাণিকতা বিচারের দিক থেকে অকাট্য নয়। ফুরুয়ী মাসায়েল এর শামিল। এখানে দলীলভিত্তিক ইখতিলাফ হতে পারে এবং হয়েছে। শরিয়ত এধরণের ইখতিলাফের স্বীকৃতি দিয়েছে এবং বহাল রেখেছে। নবীজীর যুগে, সাহাবা ও তাবেঈ যুগে এ ইখতিলাফ ছিল এবং কিয়ামাত পর্যন্ত থাকবে।

রাবেতাতুল আলামিল ইসলামী'র মাজমাউল ফিকহী (ফিকহী বোর্ড) এ ইজতিহাদী মাসাআলায় মতভিন্নতার ধরন বিষয়ে মজলিসের যেখানে সব মাযহাবের প্রতিনিধিসহ সালাফী আলেমগণও ছিলেন- সিদ্ধান্তে উল্লেখ হয়েছে:

"... وأما الثاني : وهو اختلاف المذاهب الفقهية في بعض المسائل، فله اسباب علمية اقتضته، ولله في ذلك حكمة بالغة ... فهذا النوع الثاني من اختلاف المذاهب وهو الاختلاف الفقهي ، ليس نقيصة ولا تناقصا في ديننا، ولا يمكن أن لايكون فلا يوجد أمة فيها نظام تشريعي كامل بفقهه واجتهاده ليس فيها هذا الاختلاف القفهي الجتهادي. فالواقع أن هذا الاخلاف لا يمكن أن لا يكون...".

“আর দ্বিতীয় প্রকার হলো, কিছু বিধানের ক্ষেত্রে ফিক্হী মাযহাবসমূহের মতপার্থক্য। যার অনেক শাস্ত্রীয় কারণ আছে। এবং এর পিছনে আল্লাহ'র নিগূঢ় হিকমাত আছে। ... সুতরাং এরকম মাযহাবের ইখতিলাফ দ্বীনের জন্য দোষের কিছু নয়। স্ববিরোধিতাও নয়। বরং এধরণের বিরোধিতা না হওয়া অসম্ভব । এমন কোনো জাতি পওয়া যাবে না যাদের আইন ব্যবস্থায় এ ধরনের ইজতিহাদী মতপার্থক্য নেই। সুতরাং বাস্তবতা হলো এধরণের মতভেদ না হওয়া অসম্ভব।” (আছারুল হাদীসিস-শরীফ)

এ ইখতিলাফের কারণ দলীল না জানা বা না মানা নয়। বরং দলীল অনুসরণ করতে গিয়েই এ ইখতিলাফ সৃষ্টি হয়েছে । কুরআন-সুন্নাহ থেকে সরে যাওয়ার কারণে নয়। আসবাবুল-ইখতিলাফ বিষয়ে অধ্যয়ন করলেই আমরা বুঝতে পারবো। এ প্রকার ইখতিলাপকে ইখতিলাফে মুবাহ বা শরিয়ত স্বীকৃত ইখতিলাফ বলা হয়। যা নিন্দিত নয় বরং নন্দিত। আযাব নয়; বরং রহমত। তাই মাযহাবকে নিন্দা করা বা মাযহাব অনুসরণকারীর প্রতি কুধারণা পোষণ করা নাজায়েয় ও গর্হিত কাজ।

তবে বিষয়টি এত উন্মুক্ত নয় যে, স্বেচ্ছাচারিতার অনুপ্রবেশ ঘটবে। মনগড়াভাবে শরিয়তের ব্যাখ্যা করতে থাকবে। বরং এর নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম-যাবেতা আছে যা সাহাবা ও ইমামগণ অনুসরণ করতেন। উসূলে ফিকহের কিতাবসমূহে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা আছে। মাযহাবের মতবিরোধের বড় একটা কারণ সুন্নাহ'র বিভিন্নতা। অর্থাৎ ইবাদতের পদ্ধতি সম্পর্কিত এমন কিছু পদ্ধতি যা রাসূল এর যুগেও ছিল এবং খুলাফায়ে রাশিদীনের যুগেও ছিল। কারণ স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে উভয় সুন্নাহ বর্ণিত হয়েছে। পরবর্তিতেও উভয়ের উপর আমল বিদ্যমান ছিল। এ ক্ষেত্রে একটি মূলনীতি যা আল্লামা ইবনে তাইমিয়া রহ. এভাবে উল্লেখ করেছেন:

وقاعدتنا في هذا الباب أصح القواعد إن جميع صفات العبادات من الأقوال والأفعال إذا كانت مأثورة أثرا يصح التمسك به لم يكره شيء من ذلك بل يشرع ذلك كله كما قلنا في أنواع صلاة الخوف وفي نوعى الأذان الترجيع وتركه ونوعى الاقامة شفعها وإفرادها وكما قلنا في أنواع التشهدات وأنواع الاستفتاحات وأنواع الإستعاذات وأنواع القراءات وأنواع تكبيرات العيد الزوائد وأنواع صلاة الجنازة وسجود السهو والقنوت قبل الركوع وبعده والتحميد باثبات الواو وحذفها وغير ذلك لكن قد يستحب بعض هذه المأثورات ويفضل على بعض اذا قام دليل يوجب التفضيل ولا يكره الآخر

“এক্ষেত্রে আমাদের নীতিই সর্বাধিক সঠিক নীতি যে, ইবাদাতের বিষয়ে যদি একাধিক পদ্ধতি গ্রহণযোগ্য বর্ণনায় পওয়া যায় তাহলে কোনো পদ্ধতিকেই মাকরুহ বলা যাবে না। বরং সবগুলোই শরিয়তসম্মত হবে। যেমন: সালাতুল খাওফের বিভিন্ন পদ্ধতি; তারজীসহ আযান ও তারজীবিহীন আযান; ইকামাতের শব্দাবলি একবার উচ্চারণ করা বা দু'বার উচ্চারণ করা; তাশাহহুদের বিভিন্ন প্রকার; নামাযের শুরুতে পড়ার বিভিন্ন দুআ; কুরআন মাজিদের বিভিন্ন কিরাত; ঈদের নামাযের অতিরিক্ত তাকবীরের বিভিন্ন নিয়ম; জানাযার নামায ও সিজদা সাহুর বিভিন্ন তরীকা; রব্বানা লাকাল হামদ বা রব্বানা ওয়া লাকাল হামদ ইত্যাদি সব বিষয়ে আমরা এটাই বলে থাকি। তবে কখনো কোনো একটি নিয়ম মুস্তাহাব হিসেবে বিবেচিত হয় এবং দলীলের কারণে অপরটির উপর প্রাধান্য দেয়া হয়। এ ক্ষেত্রেও অপরটিকে মাকরুহ বলা হয় না। " ( মাজমাউল ফাতাওয়া ২৪/২৪২-২৪৩, উম্মাহর ঐক্য, পৃ, ৬৬-৬৭)

তিনি এ প্রকার ইখতিলাফ সম্পর্কে ‘ইকতিযাউয সিরাতিল মুসতাকিম' নামক কিতাবে বিস্তারিত আলোচনা করে বলেন,

وهذا القسم الذي سميناه اختلاف التنوع كل واحد من المختلفين مصيب فيه بلا تردد، لكن الذم واقع على من بغى على الآخر فيه، وقد دل القرآن على حمد كل واحدة من الطائفتين في مثل ذلك إذا لم يحصل بغي.

“আর এপ্রকার ইখতিলাফ যাকে আমরা ইখতিলাফে তানাওউ বলেছি এতে কোনোরূপ দ্বিধা-দ্বন্দ ছাড়া প্রত্যেক পক্ষ সঠিক। কিন্তু এ প্রকার ইখতিলাফের ক্ষেত্রে যে বাড়াবাড়ি— তা নিন্দিত। কেননা, কুরআন থেকে বুঝে আসে যে, এ ধরণের ইখতিলাফের ক্ষেত্রে উভয় পক্ষই প্রশংসনীয়। যদি এক পক্ষ অপর পক্ষের উপর বাড়াবাড়ি না করে।” (ইকতিযাউস সিরাতিল মুসতাকিম’ ১/১৩৫, মাজমাউল ফাতাওয়া ২৪/২৪৫-২৪৭, দ্রষ্টব্য. যাদুল মাআদ-১/২২৬, মুআসাসাতুর রিসালা, বৈরুত।)

যে বিষয়ে একাধিক সুন্নাহ বিদ্যমান ও স্বীকৃত সে সকল ক্ষেত্রে যেখানে যে সুন্নাহর আমল আছে তা বাকি রাখা। এক সুন্নাহ দিয়ে অন্য সুন্নাহকে বাতিল করা এবং নাহি আনিল মুনকার এর আওতায় নিয়ে মানুষকে বিরত রাখা সুন্নাহ পরিপন্থি ও নাজায়েয কাজ। সালাফের কর্মধারা ছিল যেখানে স্বীকৃত সুন্নাহ চালু আছে তা আপন অবস্থায় বহাল রাখা। সংক্ষেপ করার স্বার্থে শুধু আল্লামা ইবনে তাইমিয়া রহ. এর পূর্বোল্লিখিত বক্তব্য উদ্ধৃত করা হলো। আশা করি লা-মাযহাবী ভায়েরা যারা এ ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ির শিকার এতুটুকুতেই ইবরত হাসিল হবে।

বর্তমানে লা-মাযহাবী ভায়েরা ভুল চিন্তার শিকার হয়ে সুন্নাহ থেকে দূরে সরে গেছেন। সুন্নাহর প্রতি দাওয়াতের কথা বললেও সুন্নাহ পরিপন্থি পদ্ধতি গ্রহণ করে থাকেন। তারা আমাদের দেশে প্রচলিত, স্বীকৃত ও দলীলসম্মত আমলকে ভিত্তিহীন, বাতিল ও ভুল বলে বিভ্রন্তি ছড়াচ্ছেন। যা সম্পূর্ণভাবে সালাফের কর্মধারার বিপরীত। তারা শুধু সালাফের নামটাই ব্যবহার করে যাচ্ছেন অথচ সালাফের নীতি-রীতি ও চিন্তা-চেতনার সাথে কোনো মিল নেই। আল্লাহ তাআলা আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন। আমীন।